শনিবার, ১৫ Jun ২০২৪, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বে-সরকারি ভাবে নির্বাচিত কসবায় ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ আহত-৪ কসবায় এলজিইডি’র শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আগরতলায় স্রোত আয়োজিত লোকসংস্কৃতি উৎসব কসবা প্রেসক্লাব সভাপতি’র উপর হামলার প্রতিবাদে মানবন্ধন ও প্রতিবাদ সভা কসবায় চকচন্দ্রপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক ফলাফল ঘোষণা, পুরস্কার বিতরণ ও ছবক প্রদান শ্রী অরবিন্দ কলেজের প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠান আজ বছরের দীর্ঘতম রাত, আকাশে থাকবে চাঁদ বিএনপি-জামাত বিদেশীদের সাথে আঁতাত করেছে-কসবায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ১৩ দিনের জন্য ভোটের মাঠে নামছে সশস্ত্র বাহিনী

কোজাগরী

সুকন্যা সাহা

” বউমা অ বউমা … বেলা চাইরটা বাইজ্যা গেল এখনও তুমি খাইলা না … কই কি নিজের কথা না হয় নাই ভাবলা প্যাটের শত্তুরটার কথা তো ভাববা ” গজগজ করতে থাকেন কিরণবালা। আর যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সেই দুগগা তখন কলতলায় এককাঁড়ি বাসন মাজছে । রোগা ডিগডিগে চেহারা খাটতে খাটতে চোখের তলায় গাঢ় কালি। তার মধ্যে বিসদৃশ ভাবে বেরিয়ে আছে পেটটা । জানান দিচ্ছে
অনাগত শিশুর উপস্থিতি।
মা মরা দুগগা অল্প বয়েসে দেখতে শুনতে মন্দ ছিল না … মা মরা মেয়েকে দেখবে কে এই অজুহাতে বাপ তারাপদ সাত তাড়াতাড়ি পার করেছিল মেয়েকে। তার পিছনে অবশ্যি যে অন্য কারণ ছিল সেটা দুগগা বুঝেছিল পরে। বছর না ঘুরতেই একটা কচি মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিল তারাপদ। বাপের ঘরে স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও অভাবও কোনদিন দ্যাখেনি দুগগা। খেয়ে পড়ে ভালোই ছিল। খালি মাধ্যমিকটা আর পাশ দেওয়া হল না। ।
ক্লাস টেনে পড়তে পড়তেই বয়েসে প্রায় দেড়া গুণ বড় চটকলের কর্মচারী ভবেশের সঙ্গে সম্বন্ধটা পাকা হয়ে যাওয়ায় আর দেরী করেনি তারাপদ। একমাত্র মেয়ে দুগগাকে পার করতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল সে। আর পাত্র হিসেবে ভবেশ এমন
কিছু ফেলনা নয় । স্থায়ী চাকরি চটকলে। বাপ মায়ের এক ছেলে ।এক দিদি আছে বটে ; তবে তার অনেকদিন আগেই বিয়ে থা হয়ে গেছে । সে দিক থেকে একদম ঝাড়া হাত পা

তবে এরকম সুপাত্র ছেলে যে কতটা সুপাত্র সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিল দুগগা বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে … নাহ নেশা ভাঙ করত না ভবেশ … তবে তার ওই এক নেশা মেয়েমানুষের … রাত্তির হলেই আর মানুষ থাকত না লোকটা …দুগগাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেত একেবারে। সেই জন্যিই তো দু দুবার পোয়াতি হয় দুগগা …নাহ টেঁকেনি একটাও … গর্ভ ফুল ঝরে গেছিল গর্ভের অন্ধকারেই … শুধু কষ্ট আর রক্তপাতই সম্বল দুগগার ।
দু দুবার গর্ভপাতের জন্যই হোক বা বাপ পয়সা কড়ি না দিয়ে পার করেছে সেজন্যই হোক শ্বশুর শাশুড়ির দু চক্ষের বিষ ছিল দুগগা। এতগুলো লোকের রান্না ,ঘরমোছা , বাসন মাজা সব বৌয়ের ঘাড়েই ঠেলে দিয়েছিল শাশুড়ি । শুধু পিস-শাশুড়ি কিরণবালাই ছিল দুগগার আপনজন । কিরণ বালারও তিন কুলে কেউ ছিল না, মা মরা দুঃখী মেয়েটাকে তিনি আপন করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন ।

বাড়ির কাছে অষ্টাঙ্গ হাসপাতালে কার্ড করিয়েছে দুগগা । ভবেশই নিয়ে গিয়েছিল। এবার কেন জানি না ভবেশের খুব উৎসাহ । ডাক্তার লিখে দেওয়ার পর চেনা কোন ক্লিনিক থেকে ফটোক করিয়ে নিয়ে এল । রাতে দুগগার কানের কাছে মুখ নিয়ে
ফিসফিস করে বলল- এবার ছেলে হবে রে আমাদের , ডাক্তার তো তাই বলল। ভবেশের কথা শুনে একেবারে নিভে গিয়েছিল দুগগা … তার খুব ইচ্ছে ছিল মেয়ে হোক।

প্রেসক্রিপশান লিখতে লিখতে ডাক্তার বাবু ভবেশকে বললেন, এবার বউকে একটু ডিম , দুধ , ফল টল খাওয়ান। একেবারে রক্ত শূন্য ফ্যাকাশে চেহারা, আর কাজ কমাতে হবে, এত পরিশ্রম চলবে না। হাত কচলাতে কচলাতে ভবেশ বলে “আমি তো চেষ্টার ত্রুটি করি না ডাক্তার বাবু, তবে কিনা একটা লোকের আয়ের ওপর এতবড় সংসার, তারপর চাকরিও তো আহামরি কিছু নয় !
দুগগার মুখে এসে গিয়েছিল, মদ আর মেয়েমানুষের পেছনে ওড়ানোর বেলায় তো ঠিক টাকা থাকে !! বলল না … বাইরের লোকের সামনে বলে আর কি হবে ? সবই তার কপাল। এবারে পোয়াতি হলে পরে ভবেশকে একদিনও কাছে ঘেঁষতে দেয় নি দুগগা। কি জানি আবার যদি আগের বারের মতো- একদিন রাতে বিছানায় এসেছিল ভবেশ, মুখ দিয়ে ভক ভক করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। ছিটকে সরে যায় দুগগা, তারপর থেকে ক মাস ধরে পিসশাশুড়ি কিরণ বালার কাছেই ঘুমায় সে …

রাতের বেলা ছাদের চিলেকোঠার ঘরে ঘুমান কিরণবালা । বালিশ আর চাদর নিয়ে গুটি গুটি উপরে উঠে আসে দুগগা । কিরণবালা কত গপ্পো করেন। তার ছোটোবেলার গল্প ; আমগাছে উঠে কাঁচা আম পাড়ার গল্প ; নদীতে ডুব সাঁতার দেওয়ার গল্প। এক একেক দিন কিরণবালা ঘুমিয়ে পড়লে দুগগা ছাদে বেড়ায়,চাঁদের আলোয় দূর আকাশের গায়ে কি যেন খোঁজে ! সম্ভবতঃ তার ফেলে আসা ছোটোবেলা …ছোটোবেলা থেকেই জোৎস্নার আলো বড্ড টানে দুগগাকে …গ্রামে থাকতে বানভাসি জ্যোৎস্নায় মাঠের আলের ওপর দিয়ে সে হেঁটে যেত মাইলের পর মাইল… অমাবস্যার অন্ধকারের পর ধীরে ধীরে কি করে চন্দ্রকলা বৃদ্ধি পায় তা দেখত সে অবাক চোখে … বড় সাধ ছিল মেয়ে হলে নাম রাখবে কোজাগরী … লক্ষী পিতিমের মতো টানা টানা নাক মুখ চোখ … কিন্তু তা তো আর হবার নয় …ভগমান তার কথা শুনলে তো!

দেখতে দেখতে দুর্গা পূজা গিয়ে লক্ষী পূজো চলে আসে। দুগগা এখন ভরা মাসের পোয়াতি । চেহারা এক্কেবারে কালিবন্ন হয়ে গ্যাছে। শাশুড়ি দেখে নিশ্চিন্ত, যাক বাবা ছেলেই হবে । ছেলে পেটে এলেই মায়ের এমন চেহারা হয় । দুগগার শ্বশুরবাড়িতে আলপনা নৈবেদ্যে লক্ষী পুজো হয় ভালভাবেই বাঙ্গাল তো! ভরা মাসের পেট নিয়ে দুগগা আর কোনো কাজ করতে পারে না। লক্ষী পূজোর ঠিক আগের দিন তার প্রসব বেদনা শুরু হয়। ভবেশ ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে । হাসপাতালে ভর্তি হয় দুগগা। ভবেশকে অবাক করে দিয়ে আর ডাক্তারি রিপোর্ট মিথ্যে প্রমাণ করে মেয়ে হয় দুগগার, মেয়ে হয়েছে বলে দুগগার শাশুড়ি বাচ্চা দেখতেও আসেননি। শুধু কিরণবালা ফোকলা দাঁতে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করেন মেয়েকে-
বলেন , বউ মাইয়ার নাম রাখিস কোজাগরী । মেয়েকে কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে দুগগা হাসপাতেলের জানলা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকায়। সেখানে তখন বানভাসি জ্যোৎস্না …

সুকন্যা সাহা
কলিকাতা , লেকটাউন

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD