মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ০৬:৫৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বে-সরকারি ভাবে নির্বাচিত কসবায় ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ আহত-৪ কসবায় এলজিইডি’র শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আগরতলায় স্রোত আয়োজিত লোকসংস্কৃতি উৎসব কসবা প্রেসক্লাব সভাপতি’র উপর হামলার প্রতিবাদে মানবন্ধন ও প্রতিবাদ সভা কসবায় চকচন্দ্রপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক ফলাফল ঘোষণা, পুরস্কার বিতরণ ও ছবক প্রদান শ্রী অরবিন্দ কলেজের প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠান আজ বছরের দীর্ঘতম রাত, আকাশে থাকবে চাঁদ বিএনপি-জামাত বিদেশীদের সাথে আঁতাত করেছে-কসবায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ১৩ দিনের জন্য ভোটের মাঠে নামছে সশস্ত্র বাহিনী

জ্যোৎস্নার আলো

জয়ন্ত বাগচী
বাইরে এমন সুন্দর জ্যোৎস্না আর আপনি ঘরের ভিতর চুপ করে বসে আছেন , কথাটা বলতে বলতে ঘরে আসে সুজাতা । সুজাতা রায় । আনন্দর বন্ধু তাপসের স্ত্রী । বড়দিনের ছুটিতে আনন্দ তার দুই বন্ধু তাপস আর সুবীর স্ত্রীদের নিয়ে বেড়াতে এসেছে সমুদ্র সৈকত দীঘাতে । টেবিলের কাছে আসে সুজাতা । কি লিখছেন কবিতা বুঝি ? না না তেমন কিছু নয় । সুজাতা বলে ,বাইরে গিয়ে একবার দেখুন, জ্যোৎস্নায় চারিদিক ভরে গেছে । কি দেখাচ্ছে সমুদ্রটাকে ! আর ওই ঝাঊবনের ভিতর দিয়ে থালার মতন বিরাট চাঁদ । আহা ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না । চলুন চলুন——
আনন্দ বলে,আচ্ছা চলো আমি দুমিনিটের মধ্যেই আসছি । ভেরি গুড । আসুন । বলতে বলতে সুজাতা ঘরের বাইরে চলে যায় ।
আনন্দ ঘরের জানালাটার কাছে এসে দাঁড়ায় । বাইরেটা জ্যোৎস্নার আলোয় ভরে গেছে । সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে । দীঘার সমুদ্র সৈকতে এই জ্যোৎস্না তার কাছে নতুন নয় । এর আগেও সে এখানে এসেছে । বেশ কবছর আগে । আর—-
কি হোল রে আনন্দ, আয় । বলতে বলতে ঘরে আসে সুবীর ।এখনো রেডি হোসনি ?
হ্যাঁ হ্যাঁ আমি রেডি চল ।।
সমুদ্রের ঢেউগুলো ভাঙছে আর তার সাদা ফেনাগুলো চাঁদের আলোয় রুপোর পাতের মত চকচক করছে । চলতে চলতে সুদীপা বলে, এখানে একটু বসি । বালির ওপর বসে পড়ে । সুজাতা একটু দূরে বসে । আনন্দ একটা ঝাঊ গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । সুদীপা বলে , সুজাতা একটা গান কর । আনন্দ বলে, হ্যাঁ একটা গান হোক । সুজাতা শুরু করে , হিমের রাতে ঐ গগনের দীপগুলিরে হেমন্তিকা ——
গান শুনতে শুনতে আনন্দর মন ভেসে যায় আর এক হিমের রাতে । সেদিনও ঠিক এমনি মায়াবী জ্যোৎস্নার আলোয় ভরে ছিল এই দীঘার ঝাঊ বন , বালিয়ারী । বন্ধু শ্যামল এসে বলেছিল , কিরে তুই এখানে ,ওদিকে রাত্রি তোর জন্য ঝাউবনে অপেক্ষা করছে ।
কথাটা শুনে আনন্দ চমকে উঠেছিল । ঝাউবনে ? মানে ? সঙ্গে আর কে আছে ? শ্যামল হেসে বলে,বন্ধু এই চাঁদনী রাতে কেউ কি সঙ্গী নিয়ে অভিসারে যায় ? সে একাই গিয়েছে । আমাকে বলেছে তোকে পাঠিয়ে দিতে । কথাটা শুনে আর দেরি করেনি আনন্দ । সন্ধ্যায় নির্জন ঝাউবনে একটা মেয়ে একাকী ,এটা মোটেই ভালো ব্যাপার নয় ।
চাঁদের আলোয় একটা ছায়াময় পরিবেশে কিছুটা দূরে একটা পড়ে থাকা ঝাউ গাছের গুঁড়ির ওপর বসে আছে রাত্রি । আনন্দ কাছে যেতেই তাকে দেখে বলে,কি গো বন্ধুদের পেয়ে আমাকেই ভুলে গেলে নাকি?
—কাজটা তুমি ভালো করোনি রাত্রি । একা একা এখানে আসাটা নিরাপদ নয় ।
— তা জানি ,তবে আমি তো তোমাদের থেকে বেশি দূরে যাইনি । তাছাড়া তোমাকে পেতে আমি সব ভয় দূর করতে পারি ।
–তা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি টা মানতে হয় ।
— এমন একটা দিন আর তুমি পাবে!
চলো ওই জলে ভাসা নৌকাটাতে বসি । ওটা তো বাঁধাই আছে । চলো ।
ঝাউবন পেরিয়ে নরম ভিজে ভিজে বালির ওপর দিয়ে তারা বাঁধা নৌকার দিকে এগোয় । এক লাফে আনন্দ নৌকায় উঠে পড়ে । উপরে উঠে হাত ধরে রাত্রিকে টেনে তুলে নেয় । রাত্রির নরম শরীরটা আনন্দের গায়ে এসে পড়ে । রাত্রির শ্যাম্পু করা
চুল হওয়ায় উড়ছে । ফর্সা মুখে নীলচে চাঁদের আলো পড়ে একটা মোমের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে রাত্রিকে । হাওয়ায় গুচ্ছ চুল আনন্দের চোখ মুখ ঢেকে দেয় । রাত্রি আনন্দকে দুহাতে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে ।
আনন্দ কোন কথা বলতে পারে না ।একটা অদ্ভুত বিস্ময় মাখা ঘোরে সে ভেসে যায় । রাত্রির নরম শরীরটা তার দেহের সাথে মিশে আছে । জলের ঢেউয়ে নৌকার সাথে তারাও দুলছে । আনন্দ রাত্রির মুখটা দুহাতে তুলে ধরে এগোতেই রাত্রি বলে-নাহ । বলেই আনন্দকে ছেড়ে দিয়ে নৌকার একটা দিকে সরে যায় ।আনন্দ বলে, কি করছো জলে পড়ে যাবে । তুমিতো সাঁতার ও জানো না ।
সাঁতার জানি না তবু তোমাকে ভরসা করে এই ঢেউয়ের মধ্যে ভাসছি । আর তুমি ? আমাকে এড়িয়ে চলছো সেই সকাল থেকে ! আমি তোমাকে ভালোবাসি আনন্দ । কিন্তু আমি প্রতিদানে কি পেয়েছি , দিনের পর দিন শুধু অবহেলা । আজ দুবছর হয়ে গেল তবু আমি তোমাকে আজও বুঝতে পারিনা । তুমি আমাকে ভালোবাসো না কি বাসো না সেটাও পরিষ্কার করে কোনদিন বলোনি । আবার এক এক সময় এমন করেছ যাতে প্রমাণ হয়েছে তুমি আমাকেই ভালোবাসো । তোমার এই দ্বিমুখী চরিত্র আমাকে বার বার ভাবায় ।
বলতে বলতে কাছে আসে রাত্রি । আজ পরিষ্কার করে তুমি আমাকে বলতো-তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো কি না ?
–এই কথাটার কোন উত্তর আমি নিজেও আজও পাইনি । আসলে তোমার আমার সম্পর্কটা এমনভাবে শুরু হয়েছিল , যাতে আমি তোমাকে ভালোবাসবো এমন কোন ভাবনাই আমার ছিল না । তোমার মনে তাগিদটা ছিল বেশি । কিন্তু আমার মনে সে ভাবনা ছিল না । তাই তোমাকে নিয়ে আমার মনে ভাবনাটা ঠিক এই নৌকাটার মতো , শুধু দোল খেয়ে চলি । স্থির কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি না ।
—–তুমি একটা ভালো কোম্পানিতে ভালো পোস্টে চাকরি করছো । তাই বলে আমি তো তোমাকে কোনদিন বলিনি আমাকে বিয়ে করো ।
—– আমি এভাবে কিছু ভাবিনি । তাছাড়া আজ হঠাৎ- – – –
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রাত্রি বলে – হ্যাঁ হঠাৎই । আমি দিনের পর দিন ভেবেছি কিন্তু তোমার দিক থেকে কোন উৎসহজনক সাড়া না পেয়েই আমি ঠিক করেছিলাম এই দীঘাতে এসে তোমাকে একা পেয়ে বিষয়টা ফাইনালি জেনে নেবো ।
— ফাইনালি মানে ? কি বলতে চাইছ তুমি ?
—এটাই বলতে চাই আজ দু বছরেও যে বরফ গলেনি, তা যে আর কোনদিনই গলবে না, সেটা আমি বুঝতে পারছি । তুমি আমাকে কোনদিনই বিয়ে করবে না ,এটা আমি নিশ্চিত ।
—-তুমি তো দেখছি আজ তৈরি হয়েই মাঠে নেমেছ ।
— অবশ্যই । তুমি দিনের পর দিন আমার সাথে ঘুরবে, সময় কাটাবে অথচ আমাকে জীবনসঙ্গী করার ভাবনাটা কোনদিন ভাববে না এটা তো চলতে পারে না !
— কেন তোমার বাড়ি থেকে বিয়ের ব্যাপারে কোন কথা হচ্ছে নাকি ?
–মেয়ে উপযুক্ত হলেই সব বাবা মায়েরাই তার বিয়ের জন্য ভাবনা চিন্তা করেন ।

এমন সময় পাড় থেকে শ্যামলের গলা পাওয়া গেল, আনন্দ নেমে আয়,জোয়ার আসছে । আনন্দ উঠে দাঁড়ায়। বলে চলো , শ্যামল ডাকছে , জোয়ার আসছে ।
— আসুক জোয়ার । আমি এখানেই থাকবো ।
—কি ছেলেমানুষি করছো!জোয়ারের ধাক্কায় জলে পড়ে গেলে তোমাকে আর খুঁজে পাবো ?
— শুকনো ডাঙাতেই কি খুঁজে পেয়েছো?
— চলো ,চলো
—না , আমার কথার উত্তর দাও তুমি ।
–রাত্রি , অকারণে ছেলেমানুষি কোরো না ।
—অকারণ ? এটা অকারণ হলো ? তবে কারণ কোনটা সেটাই বলো ।
আনন্দ এগিয়ে এসে রাত্রির হাতটা ধরতেই এক ঝটকায় হাতটা ছড়িয়ে নেয় রাত্রি । তুমি আমাকে ছোঁবে না। দিনের পর দিন আমি আমার মন প্রাণ সর্বস্ব তোমাকে দিয়েছি আর তুমি——কান্নায় ভেঙে পড়ে রাত্রি ।
হিমেল হওয়া সাগরের ওপর দিয়ে বয়ে আসছে। সাথে সমুদ্রের অশান্ত গর্জন । দাঁড়িয়ে থাকা রাত্রির শ্যাম্পু করে কেশরাশি পতাকার মতো উড়ছে । পূর্ণিমার নরম আলো তার সাদা শরীর থেকে পিছলে যাচ্ছে । একটা পরিপূর্ণ ছবির মতো । পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকিয়ে সাদা সাদা মেঘের টুকরোগুলোকেও যেন প্রশ্নবোধক চিহ্ন মনে হচ্ছে । তারাও যেন রাত্রির হয়ে আনন্দকে প্রশ্ন করছে । স্থানূর মতো দাঁড়িয়ে থাকা রাত্রির দিকে তাকিয়ে আনন্দ কি করবে কিছুই ভেবে পায় না ।
আনন্দদা আপনি কি ভাবছেন ? এদিকে তো আপনার বন্ধুরা বোতল ফাঁকা করে ফেললো । এবার ওদের উঠতে বলুন না হলে তো বালিতেই শয্যা নেবে শেষকালে ।
সুজাতার কথা শুনে আনন্দ তাড়াতাড়ি তাপস আর সুবীরের কাছে যায় । বলে , এবার ওঠ । অনেক রাত হয়েছে । চল । তার কথা শুনে সুবীর অট্টহাসি হেসে বলে ,কে বলেছে রাত হয়েছে, এখন তো কলির সন্ধ্যা গুরু !
তাপস বলে , ব্যাটার নেশা ধরে গিয়েছে । তাহলে আর না । ওকে তোল ।
সুবীরকে ধরে এক পা এক পা করে এগোতে থাকে । আনন্দ একবার পিছন ফিরে সমুদ্রের দিকে তাকায় । সেই এক রকম দৃশ্য । সেদিনের মতোই ।
সেই দিনের পর থেকেই আর রাত্রির সাথে দেখা হয়নি। খোঁজ নিয়ে জেনেছিল কোডার্মায় ওর দিদির কাছে চলে গিয়েছে । তবুও মাঝে মাঝে মনে পড়ে কিন্তু আগের মতো ব্যথা অনুভব করে না । সেটা না দেখার কারণে নাকি সত্যিই প্রেমহীন সম্পর্কের কারণে তা সে আজও বুঝে উঠতে পারে না । হোটেলের রিসেপশনে এসে একটা সোফায় বসে আনন্দ ।
সুজাতা বলে,বসলেন যে ? ওপরে যাবেন না ?
আনন্দ বলে, তোমরা যাও আমি আসছি । ওরা যে যার ঘরের দিকে পা বাড়ায় । আনন্দ কি ভেবে আবার গেটের দিকে যায় । গেট বন্ধ । বাইরে তাকিয়ে দেখে তখনও ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো খেলা করে বেড়াচ্ছে,এক মায়াবী রূপ নিয়ে ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD