মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৪০ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বে-সরকারি ভাবে নির্বাচিত কসবায় ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ আহত-৪ কসবায় এলজিইডি’র শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আগরতলায় স্রোত আয়োজিত লোকসংস্কৃতি উৎসব কসবা প্রেসক্লাব সভাপতি’র উপর হামলার প্রতিবাদে মানবন্ধন ও প্রতিবাদ সভা কসবায় চকচন্দ্রপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক ফলাফল ঘোষণা, পুরস্কার বিতরণ ও ছবক প্রদান শ্রী অরবিন্দ কলেজের প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠান আজ বছরের দীর্ঘতম রাত, আকাশে থাকবে চাঁদ বিএনপি-জামাত বিদেশীদের সাথে আঁতাত করেছে-কসবায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ১৩ দিনের জন্য ভোটের মাঠে নামছে সশস্ত্র বাহিনী

ভ্রমণ_কথা ভুটান_কথন

#পর্ব_২
————
সোনিয়া তাসনিম খান

গাড়ি ছুটে চলেছে রাজধানী থিম্পুর দিকে। দর্জির থেকে জানলাম, পৌঁছুতে প্রায় ঘন্টা খানেকের মত লাগবে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ দর্জি বলে উঠল সামনে রিভার টেম্পল আর আয়রন ব্রিজ পড়বে। তবে আজ নামা হবে না। যেহেতু, তখন সন্ধ্যার গাম্ভীর্য আকাশে লাগতে শুরু করেছে, তাই যেদিন পারো যাওয়া হবে সেইদিন এখানে কিছুক্ষণ সময় ব্যয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমরাও এতে সন্মতি জানাই।

এবার জানব একটু থিম্পু সম্পর্কে। এটি ভুটানের পশ্চিমাংশে অবস্থিত। হিমালয় পর্বতমালার একটি উঁচু উপত্যকায় এর অবস্থান। থিম্পু দেশের অন্যান্য অংশ এবং দক্ষিণে ভারতের সাথে একটি মহাসড়ক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। শহরটাতে বিমান যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা নেই। দেশের প্রায় সমস্ত বৌদ্ধ মন্দির গুলি এখানে অবস্থিত। অতীতে একে শীতকালীন রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হত। ১৯৬২ সালে শহরটাতে দেশের স্থানীয় প্রশাষণিক কেন্দ্রে পরিণত করা হয়।তবে ১৯৯৫ সালে একে স্থায়ী ভাবে রাজধানীর মর্যাদা দেওয়া হয়।

গাড়ি নানা রকম রাস্তা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছিল। অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, এখানকার ট্রাফিক সিস্টেম কতই না উন্নত! কোন গাড়ি হর্ণ দিচ্ছে না, উপোরন্তু প্রত্যেকে ট্রাফিক রুল মেনে চলছে সুশৃংখল ভাবে। জেব্রা ক্রসিংয়ের এর কাছে গাড়ি কতগুলো দাঁড়িয়ে গেল, পথচারী কজনা রাস্তা অতিক্রম করছিল। আমি বসে ভাবলাম, অনুন্নত দেশের তকমা যদি আমরা একে দেই তাহলে জাতি হিসেবে আমরা আসলে কত যোজন যোজন ক্রোশ ক্রোশ দূরে … ! এই জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা অতিক্রম এত নির্বিঘ্নভাবে একি আমাদের নিজের দেশে আমরা কল্পনা করতে পারি?

গাড়ি উঠে এসেছে ওলাখা রোডে। রাস্তার দুপাশে আরও অনেক আবাসিক হোটেল দেখা যাচ্ছে। দুধারের উঁচু পাহাড়ের ওপর এসবের অবস্থান। আমাদের হোটেল ‘হোটেল রিভারভ্যালী’ তে এসে গাড়ি থেমে যায়। সুন্দর হোটেলের আউটলুক। নিচে ভূটান ফিটনেস জোন। কাঁচের দেওয়ালের ওপারে সব স্বাস্থ্য সচেতন লোকজনের শারিরীক কসরত দেখতে পেলাম। রাস্তার অপর প্রান্তর রয়েছে হুন্ডাই এর শো রুম। আলোতে অলস ভাবে বসে থাকা গাড়িগুলি কেমন নির্জীব ভাবে চকচক করছিল। অন্ধকার নেমে এসেছে আকাশ জুড়ে। গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে যখন হোটেলের ভেতর প্রবেশ করি ততক্ষণে প্রচন্ড শীতের কামড়ে প্রায় বেঁকে গেছি। দরজা খুলে হুড়মুড় করে প্রবেশ করতেই সামনে হাসিমুখের একজন পুতুল পুতুল চেহারার মিষ্টি মেয়ে নজরে পড়ল। ভূটানিজ কায়দায় সামনে সামান্য মাথা নুইয়ে আমাদের অভিবাদন জানিয়ে বলল

: ওয়েলকাম ম্যাম, ওয়েলকাম স্যার। ওয়েলকাম টু ভুটান।

ভাবি এদের সবার হাসিই কি সুন্দর হয়? তরুণীর নাম সিন গে জ্যাম। হোটেলের কর্মরত একজন স্টাফ সে। যাহোক, ওনার উষ্ণ অভ্যর্থনার উত্তরে আমরাও হাসি বিনিময় করে নেই। আমাদের ফর্মালিটিস সব শেষ করে নিয়ে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হল উপরের তলায়। আমাদের ভারী ভারী লাগেজগুলি ঐ হাস্যোজ্জ্বল তরুণী কি অবলীলায় সিঁড়ি ভেঙে উঠিয়ে নিয়ে রুমে সেট করে নিল। হাসি মুখে তরুণী বলে উঠে

: প্লিজ গিভ মী সম টাইম। আই উইল শর্টলি প্রোভাইড ইউ এন এ্যাক্সট্রা বেড এন্ড এ্যা রুম হিটার।

: থ্যাংকস। এন্ড প্লিজ গিভ সম অক্সিজেন অলসো।

সুন্দর মুখটি একটু অপ্রস্তুত হতে দেখলাম। শুকনো মুখে সিনগেজ্যাম উত্তর করে

: পারডন।

ওর প্রশ্নে হেসে ফেলি। বলি

: জাস্ট কিডিং! এ্যাকচুয়ালি আই অ্যাম আস্কিং ফর ইওর ওয়াই ফাই পাসওয়ার্ড।

এবার হাসির পরিধি আরও বেড়ে গেল। প্রবল বেগে মাথা ঝাঁকিয়ে সে উত্তর করল

: শিওর ম্যাম!

নিচে নেমে লবিতে বসে ডিনার সারি ফিশ ফ্রাই, গ্রীণ ভেজি, ডাল, রুটি, এবং রাইস দিয়ে। সুন্দর হোটেল! ছিমছাম সাজানো! রিসিপশান দেওয়ালের একদিকে ওদের ভূটান রাজপরিবারের সব রাজাদের ছবি ক্রমানুসারে সজ্জিত।এক কোণে ছোট একটি সুসজ্জিত বার দেখা গেল। হোটেলটিতে এসে আমাদের ফ্লাইটে আসা অন্যান্য আরও কিছু পরিবারের সাথে দেখা হয়ে গেল।সবার সাথে ডিনার নিতে নিতে হাল্কা কিছু আলাপচারিতার পর আমরা বাইরে বেরুলাম কিছু সময়ের জন্য। আশেপাশে কয়েকটি ওয়ানস্টপ সুপার শপ রয়েছে, ভেতরে ঢুকে কিছু স্ন্যাকস, সফট ড্রিংক্স নিয়ে নিলাম, আগামী দিনের যাত্রাপথে পেট পূজা সারতে কাজে আসবে। ইতিমধ্যে ছোট কন্যার জিদ শুরু হল খেলনা গিটার নেবার জন্য! এমন আহামরি কোন খেলনা নয়, আমাদের দেশের দোকানগুলিতে এটা অনেক দেখেছি। বড়জোর দেড়শ দুশো হবে, এখানে এটির দাম চারশ’ আশি! কোনভাবে জিদের ডিপো কে চকলেট দিয়ে বুঝ দিয়ে বেড়িয়ে আসি সেইসাথে আইডিয়াটা জমে যায় মেমরিতে ভূটান আসলে অনেক ব্যয়বহুল হবে।

হোটেলে রুমে এসে ঢুকে প্রবল সাহসের ওপর ভর করে হাতমুখ ধুয়ে রিফ্রেশ হই( যদিও গিজারের গরম পানি, তাতে কি? পানি তো!) কোনমতে বিছানায় কম্বলের নিচে ঢুকে যাই। পায়ে মোজা, গায়ে গরম জামা রুমে রুমহিটার! এতেও মনে হয় জমে যাচ্ছি! বাপস! আগামী চারদিন কিভাবে কাটবে আল্লাহই জানে! কম্বলের নিচে শুয়ে ইন্টারনেট এক্সেস করতে থাকি। একসময় ঘুম নেমে আসে চোখে। সকাল ছ’টায় সবাই হুড়মুড়িয়ে উঠি। ফজর নামাজ আদায় করে রেডি হয়ে রুমের বাইরে আসি যখন সূর্য তার ঝলমলে হাসির রেশ ছড়িয়েছে সর্বত্র! কি সুন্দর চকচকে সকাল! আমাদের রুমের বাইরে যে ওপেন স্পেস তাকে ওরা ওদের ট্র্যাডিশনাল ভূটানিজ ডাইনিং থিম এ সাজিয়েছে! দেওয়াল জুড়ে ওদের আদি শিকারকার্যের ব্যবহৃত সব হাতিয়ার দিয়ে সুসজ্জিত। কতগুলো ছবি নিয়ে নিলাম তাড়াতাড়ি। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আসি যখন তখনও ব্রেকফাস্ট টেবিলে পৌঁছুয় নি। তাই দরজা ঠেলে বাইরে যেতেই শীতের লক্ষ্য জারকাঁটা গায়ে বিঁধে উঠল! কি যে বাতাস! ভাল করে কান মাথা গরম টুপিতে ঢেকে নেই। রাস্তা দিয়ে ব্যস্ত গাড়িদের ছুটাছুটি! নিজের সামনে বিপরীতে পাহাড়েরা সব অতন্দ্র প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে, ঠিক। যেন ঘুমন্ত পুরীর ঘুমন্ত প্রহরীরা ধীরে ধীরে জিয়ন কাঠির স্পর্শে উঠি উঠি করছে। আমার মেয়ে দুটো আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করছিল! সাহেবের সাথে ছবি তুললাম কতক। ব্রেকফাস্ট রেডি! টেবিলে ফেরত গেলাম। এটি আমাদের কমপ্লিমেন্টারি ছিল! তাই বলে এত কিছু! কি ফেলে কি খাব! তবে হ্যাঁ ভূটানিজ ফল খেয়ে নিলাম বেশ পেট পুরে। এরপর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে গাড়ির জন্য অপেক্ষা! অল্পসময়ের মাঝে গাড়ি দৃষ্টিগোচর হল। গাড়ির দরজা খুলে দরজি কে হাসিমুখে নামতে দেখা গেল। আমরাও ব্যাগ প্যাক সহ নেমে পড়ি। গাড়িতে আরাম করে আসন নিয়ে বসি; দরজি কে প্রশ্ন করি

: সো, হয়ার আর উই গোয়িং নাউ?

দরজি গলা ঝেড়ে উত্তর করে

: ওয়েল! টু ডে উই উইল কভার থিম্পু। নাউ হেডিং ফর বুদ্ধা পয়েন্ট। ও.কে?

সমোস্বরে বলে উঠি

: অলরাইট বস! লেটস স্টার্ট!

গাড়ি স্টার্ট নিল। ঘুমন্ত থিম্পু শীতের ঘুম থেকে জেগে উঠেছে ততক্ষণে। হাল্কা নরম রোদের আদর গায়ে মেখে আমরা চলতে শুরু করলাম।অনিন্দ্য সুন্দর ভূটানের প্রেমে পড়ে গেছি সেই কখন! এখন সেই প্রেম জমে ক্ষীর হবার অপেক্ষায়।

: মা, ভূটান অনেক সুন্দর!

মেয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি রেখে উচ্ছাসিত কন্ঠে বলে উঠলে একটা আনন্দের হাসি হাসি। সাথে ছোট মেয়েও যোগ দেয়। আমাদের গাড়ি দুর্বার গতিতে ছুটে চলছে বুদ্ধা ডর্ডেনমার দিকে।

(চলবে)…..

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD