শনিবার, ১৫ Jun ২০২৪, ১১:১৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বে-সরকারি ভাবে নির্বাচিত কসবায় ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ আহত-৪ কসবায় এলজিইডি’র শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আগরতলায় স্রোত আয়োজিত লোকসংস্কৃতি উৎসব কসবা প্রেসক্লাব সভাপতি’র উপর হামলার প্রতিবাদে মানবন্ধন ও প্রতিবাদ সভা কসবায় চকচন্দ্রপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক ফলাফল ঘোষণা, পুরস্কার বিতরণ ও ছবক প্রদান শ্রী অরবিন্দ কলেজের প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠান আজ বছরের দীর্ঘতম রাত, আকাশে থাকবে চাঁদ বিএনপি-জামাত বিদেশীদের সাথে আঁতাত করেছে-কসবায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ১৩ দিনের জন্য ভোটের মাঠে নামছে সশস্ত্র বাহিনী
মহাদেবপুর জমিদার বাড়ি, নওগাঁ

মহাদেবপুর জমিদার বাড়ি, নওগাঁ

ড.মোহাম্মদ শামসুল আলম।।

মহাদেবপুর উপজেলা সদরে অবস্থিত জমিদার বাড়িটি জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কি.মি পশ্চিম-উত্তর দিকে অবস্থিত। এখানকার জমিদার ছিলেন রাঢ়ী শ্রেণির ব্রাহ্মণ। মুঘল বাদশা জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৫-১৬২৭) এই জমিদারি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বলে জমিদারির অপর নাম জাহাঙ্গীরপুর। এই জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা ও পূর্বপুরুষ ছিলেন নয়নচন্দ্র রায় চৌধুরী। তাঁর আদি নিবাস ছিল বর্ধমানে। বাংলা বিজয়ের সময়কালে মোঘলদের সহযোগিতা করার জন্য তিনি বা তাঁর উত্তরাধিকারী বিরেশ্বর রায় চৌধুরী সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে পুরস্কার স্বরূপ পরগনা জাহাঙ্গীরাবাদে জায়গির লাভ করে। এই জায়গিরই পরবর্তীতে জমিদারিতে পরিণত হয়। সম্ভবত সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারেই এই জায়গিরের নামকরণ হয়েছে জাহাঙ্গীরাবাদ এবং পরবর্তীকালে মহাদেবপুরের আরেক নামকরণ হয় জাহাঙ্গীরপুর। নয়নচন্দ্র রায় চৌধুরীর উত্তরাধিকারী বিরেশ্বর রায় চৌধুরী দক্ষতার সাথে এই জমিদারি পরিচালনা করেছিলেন মর্মে সন্ধান লাভ করা যায়। দৃষ্টান্ত হিসেবে পাওয়া যায় পোরশা থানার কমলদোশারী মন্দিরটির নির্মাণকলার নিদর্শন। এছাড়া প্রজাদের জনকল্যাণের কথা চিন্তা করে তিনি এই এলাকায় বহু মন্দির ও পুকুর খনন করে পানি-জলের কষ্ট লাঘব করেন। বিরেশ্বর রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর জমিদারির বন্টন হয়। বন্টনের সূত্রে ভাগ করা হয় তাঁর চারপুত্র ও পিতৃব্য পুত্র লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরীর মধ্যে। লক্ষ্মীকান্তের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ব্রজনাথ রায় চৌধুরী জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। ব্রজনাথ রায় চৌধুরী জীবিতকালেই সমুদয় সম্পত্তি তাঁর পুত্রদ্বয় দুর্গানাথ রায় চৌধুরী ও গোবিন্দনাথ রায় চৌধুরীর মধ্যে এস্টেটকে সমানভাগে ভাগ করে দেন। গোবিন্দনাথ রায় চৌধুরী ছিলেন একাধারে প্রভাবশালী, দয়ালু, সহজ-সরল ও একজন শিক্ষিত মানুষ। একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে প্রজাসাধারণের মধ্যে তিনি চরম খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। গোবিন্দনাথের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শ্যামনাথ রায় চৌধুরী জমিদারির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

পিতা গোবিন্দনাথের মতো শ্যামনাথও ছিলেন একজন প্রজাবৎসল জমিদার। তিনি মহাদেবপুরে একটি বিদ্যালয় ও একটি চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠান দুটি পরিচালনার জন্য তিনি প্রতি মাসে নিয়মিত আর্থিক অনুদান দিতেন। প্রজাদরদি এই মানুষটির মাত্র ২৪ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে (১২৮৫ বঙ্গাব্দ) একমাত্র শিশুপুত্র নরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীকে রেখে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মহাদেবপুর জমিদার বংশের শেষ জমিদার ছিলেন বড় তরফের ক্ষিতিশচন্দ্র রায় চৌধুরী এবং ছোটো তরফের রায়বাহাদুর নারায়ণচন্দ্র রায় চৌধুরী। এই রায়বাহাদুর নারায়ণচন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন জমিদার বংশের অধস্তন পুরুষদের মধ্যে শেষ জমিদার। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন নয়নচাঁদ মুখোপাধ্যায়। নয়নচাঁদ জমিদারি প্রাপ্তির পর তাঁর নামের সাথে মুখোপাধ্যায়ের পরিবর্তে উপাধি হিসেবে ‘রায়চৌধুরী’ ব্যবহার করতেন। পরবর্তীকালে তাঁর ব্যবহৃত এ পদবি উত্তরাধিকারগণও বজায় রেখেছিলেন। জমিদার গোবিন্দনাথের পুত্র শ্যামনাথ রায় চৌধুরী দিনাজপুর শহরে একটি ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন। এর জন্য মোটাঅংকের অর্থও তিনি ব্যয় করেছিলেন। আবার ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সে দুর্ভিক্ষে তিনি রিলিফ ফান্ডে ১৫ হাজারেরও বেশি টাকা দান করেছিলেন। সেইসাথে রাস্তা নির্মাণ, জমি প্রদান ও গরিব ব্রাহ্মণদের পুত্র-কন্যার বিবাহে আর্থিক সাহায্য প্রদান করতেন। অধীনস্থ থানাগুলোর উন্নয়নে তিনি বিভিন্ন স্কুলে নগদ অর্থ দান করতেন। দিনাজপুরের রাজ পরিবার ধর্মীয় বিষয়াদি পালনের জন্য বাৎসরিক ১৭৭৭২৭/- টাকা ব্যয় করতেন। যা মোট ব্যয়ের ৮.৪ শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত ছিল।

রায়বাহাদুর নারায়ণচন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন এখানকার শ্রেষ্ঠ ও বহুল আলোচিত জমিদার। শ্রীমতি সর্বমঙ্গলা দেবী ছিলেন তাঁর মাতা। তিনি মাতার নামানুসারে মহাদেবপুরে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে একটি স্কুল (হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করে এর নামকরণ করা হয়েছে সর্বমঙ্গলা উচ্চ বিদ্যালয়। আজও অন্যতম মহৎকীর্তি হিসেবে স্কুলটি তাঁকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রেখেছে। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের দেশভাগের পরেও তিনি দীর্ঘদিন মহাদেবপুরে বসবাস করছিলেন। তাঁর খ্যাতির সূত্রে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মহাদেবপুরে জমিদারির রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান উদ্যাপিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে হিন্দু-মুসলমানের উপস্থিতিতে একটি মিলনমেলার সৃষ্টি হয়েছিল। উভয় সম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ তাঁর জনপ্রিয়তার স্বাক্ষরকে প্রমাণ করে। তাঁর পিতামহ ছিলেন শ্যামানাথ রায় চৌধুরী এবং পিতা ছিলেন নরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী। রাজরাজেশ্বরী দেবী ছিলেন তাঁর স্ত্রী। রাজরাজেশ্বরী দেবীর পিতা নলিনীরঞ্জন ছিলেন তৎকালীন কলকাতার একজন বিচারক। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অন্দর মহলে থাকতে পছন্দ করতেন। মানুষ হিসেবে তিনি কিছুটা আত্মভোলা ও উদাসীন প্রকৃতির ছিলেন। নারায়ণ চেীধুরী ছিলেন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি। তাঁর বাড়িতে প্রায় নিয়মিত গানবাজনা, যাত্রাপালা ও লোকনাট্যের আসর বসতো। বাড়ির পাশেই ছিল একটি থিয়েটার। থিয়েটারের একজন শিল্পী হিসেবে তিনি নিজেও অভিনয় করতেন। বাদক হিসেবে নিজেই হারমোনিয়াম বাজাতেন। সাহিত্যিক আসরও সপ্তাহব্যাপী তাঁর বাসায় অনুষ্ঠিত হতো। জমিদার আমলে প্রতিবছর এখানে ‘রথের মেলা’ উৎসব পালন করা হতো। মুসলমান প্রজাদের জন্য তিনি তঁ
তাঁর বাড়ির পাশে অবস্থিত দিঘিটির ঘাট বেঁধে দিয়েছিলেন। বর্তমানেও সে ঘাটটির অস্তিত্ব দেখা যায়। যদিও বা এই ঘাটটি বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। জমিদার বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত উপকরণগুলো কালের চিহ্ন হিসেবে স্মৃতি ধারণ করে আছে।
মহাদেবপুর জমিদারবাড়িতে বড় তরফ ও ছোটো তরফ নামে দুটি প্রাসাদ বা পৃথক চত্বর রয়েছে। বড় তরফের প্রাসাদে ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জাহাঙ্গীরপুর কলেজটি স্থাপিত হয়। কলেজ স্থাপন হওয়ার পর থেকে এই প্রাসাদের নিচতলা কলেজের প্রশাসনিক ভবন, লাইব্রেরি ও ছাত্রীদের কমনরুম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর দ্বিতীয়তলা ব্যবহৃত হতো ছাত্রাবাস হিসেবে। কলেজটি সরকারিকরণ হওয়ার পর নতুন ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত নতুন ভবনে কলেজের প্রশাসনিক দপ্তর স্থানান্তরিত হওয়ায় ভবনটি সম্পূর্ণরূপে পড়ে আছে। বর্তমানে ভবনটি বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় পরিত্যক্ত রয়েছে। তবে পরিত্যক্ত ভবনটি কলেজ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রাধীন আছে। অপরদিকে ছোটো তরফের রাজপ্রাসাদগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। রাজবাড়ির সম্মুখস্থ কাছারি ভবনটিতে বর্তমানে ভারতের বর্ধমান থেকে আগত মরহুম সৈয়দ আব্দুল হামিদ খান ওরফে ক্ষুদু মিয়ার পুত্র সৈয়দ আব্দুল মজিদ ও অপর পুত্র সৈয়দ শামসুল ইসলাম কাছারি বাড়িটিতে বসবাস করছেন। ভ্রাতাদ্বয়ের দেয়া তথ্য অনুসারে জানা যায় যে, এই রাজবাড়িটি তাদের পিতা মরহুম সৈয়দ আব্দুল হামিদ ওরয়ে ক্ষুদু মিয়া এবং দাদি জায়েদাতুন্নেছা জমিদার নারায়নচন্দ্র রায়বাহাদুর, তাঁর স্ত্রী রাজরাজেশ্বরী দেবী এবং মাতা সর্বমঙ্গলা দেবীরকাছ থেকে বিনিময় সূত্রে পেয়েছেন। এই জমিদার বাড়িতে বর্তমানে যে ভ্রাতাদ্বয় বসবাস করছেন তাঁদের অবস্থাও শোচনীয়।
জমিদার বাড়ির পশ্চিম পাশের্ব একটি প্রাচীন মন্দির আছে। এটি রঘুনাথ জীও মন্দির নামে পরিচিত। বাড়ির ভেতরের কারুকার্য খচিত দালানগুলো সম্পূর্ণ বিনষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। জমিদার বাড়ির সামনে একটি বৃহৎ আকারের দিঘি অবস্থিত। এই দিঘির পানি কালো মেঘের রঙের মতো স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ছিল। বর্তমানে পানির সে রং-ও পরিবর্তন হয়েছে। পূর্বে এ দিঘির পানি পান করা হতো। এখন সেসব শুধু স্মৃতি হয়ে আছে। তবে জমিদার বাড়ির প্রধান ফটকটি আজও একই অবস্থায় ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। ফটকের মাথায় জমিদার আমলের নির্মাণ করা কারুকার্যময় শিল্পকলার নিদর্শনসমূহ দর্শকদের আকৃষ্ট করে। দেয়ালের মাথায় বসানো সিংহমূর্তির ভাস্কর্য দুটি যেন শিল্পের আদি নিদর্শন ও কারুকার্য। মূল ফটকের সামনে অবস্থিত পুরাতন জমিদার বাড়ির একাংশটি সংস্কার করে বর্তমানে জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজের ছাত্রাবাস করা হয়েছে। যে জমিদার বাড়িতে একসময় জনসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল সংরক্ষিত। আজ সেখানেই in দল চলছে সর্ব সাধারণের রাজত্ব ও আনাগোনা। জাতি লুপ্ত হলেও থাকে তার ইতিহাস। তারই ধারাবাহিকতায় এ রাজবাড়িটির কথা লোকান্তরে আজও রয়েছে মানুষের মনে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি হিসেবে।

ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম
গবেষক, প্রাবন্ধিক, ইতিহাসজ্ঞ
এবং
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
বাংলা বিভাগ, নওগাঁ সরকারি কলেজ, নওগাঁ

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD