মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বে-সরকারি ভাবে নির্বাচিত কসবায় ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ আহত-৪ কসবায় এলজিইডি’র শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আগরতলায় স্রোত আয়োজিত লোকসংস্কৃতি উৎসব কসবা প্রেসক্লাব সভাপতি’র উপর হামলার প্রতিবাদে মানবন্ধন ও প্রতিবাদ সভা কসবায় চকচন্দ্রপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক ফলাফল ঘোষণা, পুরস্কার বিতরণ ও ছবক প্রদান শ্রী অরবিন্দ কলেজের প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠান আজ বছরের দীর্ঘতম রাত, আকাশে থাকবে চাঁদ বিএনপি-জামাত বিদেশীদের সাথে আঁতাত করেছে-কসবায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ১৩ দিনের জন্য ভোটের মাঠে নামছে সশস্ত্র বাহিনী
লোকসংগীতের এক বহমান ধারা শিল্পী আব্বাস উদ্দিন

লোকসংগীতের এক বহমান ধারা শিল্পী আব্বাস উদ্দিন

পাভেল আমান

বাংলার আবহমান লোকসংগীত জগতের এক প্রবাদপ্রতিম তথাকথিত উজ্জল নক্ষত্র রূপে বিরাজ করছেন আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। অসাধারণ মরমি গায়কীতে, কন্ঠের সুর মূর্ছনায় তিনি আপামর বাঙ্গালীদের কাছে ভাটিয়ালি ও ভাওয়াই গানের লোকসঙ্গীতের এক অন্য ধারার সুরেলা শিল্পী রূপে সম্মানিত হয়ে আছেন। যুগ ব্যাপী তার গানের জাদুতে দুই বাংলার বাঙালি শ্রোতা বুঁদ। হয়েছিলেন তার গান ছিল মানুষের সুখ দুঃখের, মাটির সুর মিশানো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার।১৯০১ সালে ২৭ অক্টোবর কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জের বলরাম পুর গ্রামে তার জন্ম। মায়ের নাম হিরামন নেসা। পিতা মহম্মদ জাফর আলি কোচবিহার জেলার একজন সেকালের বিখ্যাত উকিল ও জমিদার। আব্বাস উদ্দিন ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিমান ও মেধাবী ছিলেন। পড়াশোনাতোও যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন । তিনি শিক্ষকদের কাছে অচিরেই আদর্শ ও মেধাবী ছাত্র রূপে নিজেকে প্রমাণ করে ছিলেন। শৈশব অবস্থা থেকেই তাঁর গানের প্রতি ছিল প্রচণ্ড অনুরাগ ও ভালোবাসা। নানাবিধ প্রতিকুলতায় তিনি সেরকম কারোর কাছ থেকে গান শেখার উৎসাহ, আগ্রহ ও তালিম পাননি। তিনি শিখেছিলেন গ্রামের গায়ক,ক্ষেত মজুর কৃষকের মুখের গান শুনে শুনে। এইসব মানুষের সহজাত গান তার মধ্যে এক প্রচণ্ড উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। ।কিন্তু গানের সুর তারমধ্যে সর্বদায় তাড়িত করত। একসময় তাঁকে ভাওয়াইয়া শিখতে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করেছিল তাঁরই গ্রামেরই শিল্পী পাগারম্নও নায়েব আলি টেপুর। স্কুলে যাওয়া কিংবা আসার পথে গলা ছেড়ে তিনি ভাওয়াইয়া গান গাইতে গাইতে পথ চলতেন।
কোচবিহারের বলরামপুর স্কুলে পঞ্চমশ্রেণী পর্যন্ত প্রথম স্থান ছিল তাঁর দখলে ছিল।
কলকাতায় বিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সূচনা হয় সংগ্রামী এক বর্ণময় শিল্পী জীবনের বিকাশ পর্ব। সেই সময়ের বাংলাদেশের মুসলিমদের নিকটে সহজাত প্রতিভা কে মেলে ধরার দুটি মাধ্যম ঔ ছিল। একটি তাদের মনেরকথা লোকগীত,অপরটি প্রাণের কথা ইসলামী গান।
১৯৪৭ সালে ১৪ অাগষ্টের পর তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্থানে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। চাকরি নিয়েছিলেন পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে। সেই সময় কোচবিহারের একটি অনুষ্টানে আব্বাস উদ্দিন আহমেদের গান শুনে কবি নজরুল ইসলাম প্রচন্ড মুগ্ধ হয়ে শিল্পীকে কলকাতায় আসার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলেন।
আব্বাস উদ্দিন আহমেদ মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানিতে দুটি গান রেকর্ডিং করেছিলেন বিমল দাশগুপ্তের সহযোগিতায়।“কোন বিরহির নয়নজলে বাদল ঝরে গো” অপরটি “স্মরণ পারে ওগো প্রিয়” গানদুটি সেই সময়ে অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল শ্রোতাদের কাছে। তদুপরি শিল্পী কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেন। এই সময় বিদ্রোহী কবি নজরুলের গভীর সান্নিধ্যে আসেন আব্বাস উদ্দিন আহমেদ এবং নিজের গানের জগতে পরিচিতির বিস্তার ঘটানো। পরে কবি নজরুলের ঐকান্তিক সহযোগিতায় একাধিক ভাওয়াইয়া গানের রেকর্ড হয়েছিল। ভাওয়াইয়া গানের কথা আলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবেই উঠে আসবে ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিন আহমেদের নাম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাওয়াইয়াকে তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন, তাতে লোকসমাজ তার প্রতি চিরঋণী। লেখার প্রথমে উল্লিখিত ভাওয়াইয়া পদটি তারই লেখা। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বন্ধু ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের। এইচএমভিতে নজরুল যখন কাজ করতেন, তখন তার লেখা প্রথম ইসলামী গান আব্বাস উদ্দিনের সৌজন্যেই রেকর্ড করা হয়। তার আগে থেকেই আব্বাস নজরুলগীতি ও অন্যান্য গান গেয়ে প্রভূত প্রশংসা কুড়োচ্ছেনকবি নজরুলের লেখা ও সুরে এবং আব্বাস উদ্দিনের দরদী কন্ঠে গান গুলি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এককালীন বাংলার সংগীত জগতে এবং অগণিত শ্রোতাদের দরবারে।

আব্বাস উদ্দিনের আধুনিক গানের সংখ্যা ও অগণিত। আবার তিনি পল্লীগীতি ,ইসলামী গান ,ভাওয়াইয়া কাব্যগীতি গেয়েছেন। সংগীতের প্রতিটি বিভাগেই তিনি ছিলেন যথেষ্ট সাবলীল এবং এক বিস্ময় প্রতিভা। তার সুরেলা জাদুর কন্ঠে প্রতিটি গান যেন শ্রোতাদের মনকে প্রচন্ড বিমুগ্ধ করত। গানের সঙ্গে তার জন্য এক আত্মিক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সংগীত জগতে বিচরণ করি এক গান ফকির ।এমনকি যে তিনি সেই সময়ে ইসলামী গানকে দরদী গলায় প্রাণ খুলে গিয়েছিলেন বলেই তৎকালীন মুসলীম সমাজের সাংস্কৃতিক উন্মেষ ঘটেছিল । তাদের মধ্যে ধর্মীয় বেড়াজাল, কুপমন্ডুকতা, কুসংস্কার অতিক্রম করে এখ মুক্ত চিন্তার উদার সাংস্কৃতিক বোধের উদয় হয়েছিল। এক সময় যে গানকে হারাম বলে কানে আঙুল দিতেন মুসলমানরা। পরে তারাই আব্বাস উদ্দিনের দরাজ কন্ঠের গান শুনে বিষ্ময় হয়েছিলেন “মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ” “ত্রিভুবনের প্রিয় মহম্মদ এলোরে দুনিয়ায়” ইসলামী গান শুনে। সেই সময়ের মুসলিম সমাজ যেন তাদেরক অস্তিত্ব, চেতনা, পরিচিতি তথা মিলে ধরার, মনের ভাবনা প্রকাশ করার এক নির্ভরযোগ্য, অবলম্বন হিসাবে পেয়েছিল এবং সাদরে গ্রহণ করেছিল আব্বাসউদ্দীনকে। সাংগীতিক প্রতিভার পাশাপাশি তার সাবলীল, বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব ও তৎকালীন মুসলিমদের কাছে ছিল এক রোল মডেল।পরবর্তীকালে কবি নজরুলের লেখা ও সুরকরা রোজা,নামাজ,হজ যাকাত,ঈদ,শবেরাত ফাতেহা,ইসলামী গজল সহ একাধিক গানে কন্ঠ দিয়েছিলেন। তিনি অসংখ্য পল্লীগীতি,মুর্শিদীজারী,সারি,ভাটিয়ালী,হামদ্, নাত, ও পালাগান গেয়েছেন সাফল্যের সঙ্গে। গায়কের পাশাপাশি আব্বাস উদ্দিন আহমেদ অভিনয় ও করেছিলেন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে। তিনি “বিষ্ঞু প্রিয়া” “মহানিশা” “একটি কথা ও ঠিকাদার” ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তিনি শিকাগো,লন্ডন,নিউইয়ার্ক,প্যারিস,জাপান,অষ্ট্রেলিয়া সহ পৃথিবীর বহু দেশে সসম্মানে , দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে পল্লীগীতি,ভাওয়াইয়া গান গেয়েছেন। ১৯৫৫ সালে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলিয়ায় দক্ষিণ এশিয়া সঙ্গীত সম্মেলনে ও ১৯৫৬ সালে জার্মানীতে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলন সহ আরো অন্যান্য অনেক আন্তর্জাতিক সঙ্গীত সম্মেলনে অংশ গ্রহন করেছিলেন। পল্লীগীতি,ভাওয়াইয়া, গানের জনক , ধারক ও বাহক আব্বাস উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য রোগে ভুগেছিলেন। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে পল্লীকবি হিসেবে খ্যাত জসীম উদ্দিনের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠলে দুজনে মিলে কলকাতা শহরে লোকসঙ্গীতকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন। তাকে ভাওয়াইয়া সম্রাট নামে ডাকা হলেও কলকাতায় এসে প্রথম দিকে তিনি ভাটিয়ালি গেয়েছিলেন। ভাওয়াইয়া গানে বাদ্যযন্ত্রের সুরের ফাঁকে ফাঁকে গানের সুরকে ভেঙে দেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে থাকে এর মাধুর্য। এ বিষয়টি আব্বাসউদ্দিনের ছিল সহজাত। তিনি অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে সুরের ভাঙনে সুর তুলতে পারতেন। ফলে, তার কণ্ঠে ভাওয়াইয়া যেন নবজীবন লাভ করে।দোতারাবাদক কানাইলাল শীলের সাথে তাঁর যুগলবন্দির কথা সর্বজনবিদিত। কানাই শীল ছাড়াও তার সঙ্গে বাজাতেন স্বল্প-পরিচিত অন্ধ গ্রামীন শিল্পী টগর। স্বাধীনতার পর যখন দেশভাগ হয়, তখন আব্বাস উদ্দীন ঢাকায়। ঢাকা পাকিস্তানের অংশ হলো। ১৪ই আগস্ট ঢাকার বেতারকেন্দ্র থেকে রাত বারোটার পর সম্প্রচারিত হলো আব্বাসের গলায় লোকগীতি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লোকসঙ্গীতের ধারাকে বিশেষত ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া গান তিনি দরদী গলায় গেয়ে দেশ তথা আন্তর্জাতিক স্তর থেকে প্রচুর খ্যাতি সম্মান এবং প্রশংসা কুড়িয়েছেন। দুই বাংলার আপামর বাঙালি মননে এখনও তার মুগ্ধ কন্ঠে অনুরণন অনুভূত হয়। এখনো তিনি তার গান গ্রাম বাংলার মানুষের বেঁচে থাকার গান, আবহমান মাটির সুরে উজ্জীবিত সেই লোকসঙ্গীতের অনন্য ধারায় তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এক অসাধারণ মগ্ন বিভোরতা যা বাঙালি সঙ্গীতপ্রেমীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। পাদপ্রদীপের পিছনে থাকা, লোকসংগীতকে তিনি কার অনবদ্য দরদী গায়কীতে, আন্তরিক প্রচেষ্টায়, নিবেদিতপ্রাণ জীবন যাপনে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অন্য জগতে যেখানে সেই লোকসঙ্গীতের পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বেড়ে গিয়েছিল। আব্বাস উদ্দিনের গান যেন হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার গান। এখানেই তার দরদি ও মরমি কণ্ঠের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, যা সম্পূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে যুগ ব্যাপী। এখানেই আব্বাস উদ্দিনের গান বিশেষত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা। আপামর বাঙালিদের কাছে তিনি এখনও বরং বরণীয় এবং স্মরণীয়। জন্মদিনে সেই মহান গায়ক এর প্রতি রইল শ্রদ্ধার্ঘ্য।

লেখকঃ পাভেল আমান-শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক-মুর্শিদাবাদ-পশ্চিমবঙ্গ

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD