পর্ব ৩
বাইশ সর্দারের ঢাকা
শান্তা মারিয়া।।
১৯৬৯ সালে আমার দাদার মৃত্যু হয়। তখন এই বাড়িতে সপরিবারে থাকতেন আমার দুই চাচা। তারাই এই বাড়িটিকে আরও বড় করে গড়ে তোলেন। খুব ছোটবেলার স্মৃতি থেকে বলতে পারি, এই এলাকায় তখন পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী ভবনের সংখ্যাই বেশি। বাড়িগুলোর ফটক ও দেয়ালে কারুকার্য করা। সিমেন্ট নয়, সুরকির বাড়ি ছিল প্রচুর। মোটা মোটা দেয়াল। কড়ি বরগার ছাদ। বেশিরভাগ বনেদী বাড়ির ফটকে নাম লেখা। ঢাকায় তখন রূপলাল হাউজ, রোজ গার্ডেন ইত্যাদি বিখ্যাত বাড়ি তো আছেই। সাধারণ অনেক বাড়িরও নামকরণ করার প্রথা ছিল।। নাজিরা বাজারে একটি বাড়ির নাম ছিল হ্যামলেট। সেটিও বিখ্যাত। বংশালে ছিল শুলসুধার বিশাল প্রাসাদ। বেগম বাজারের বাড়িতে যাওয়ার পথে দেখতাম মাজেদ সরদার, কাদের সরদার প্রমুখের বাড়ি। এগুলোকে বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই সঙ্গত। শুরু থেকেই ঢাকায় ছিল পঞ্চায়েত প্রথা। এক সময় নাকি বাইশ সর্দারের অধীনে ছিল ঢাকা। বিভিন্ন মহল্লার প্রবীণ ও প্রভাবশালী সদস্যদের নিয়ে গড়ে উঠত পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েতের প্রধানকে সর্দার বলা হতো। মহল্লার ছোট খাটো চুরি বা অন্যান্য অপরাধের বিচার হতো পঞ্চায়েতে। মূলত সামাজিক অপরাধগুলোর বিচার পঞ্চায়েতেই হতো। বিভিন্ন দ্বন্দ্ব-বিরোধের সালিশ করতেন সর্দার এবং পঞ্চায়েত। কাদের সর্দার ছিলেন বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার একজন বিখ্যাত সর্দার বা পঞ্চায়েত প্রধান। তিনি ভাষা আন্দোলনকেও সমর্থন দিয়েছিলেন।
আরেকজন বিখ্যাত সর্দার ছিলেন মাজেদ সর্দার। হাজি মাজেদ সর্দার বিংশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে খ্যাতিমান হন। তিনি পঞ্চায়েত প্রধান ও পৌরসভার কমিশনারও ছিলেন। আগা সাদেক রোডে তার বিশাল বাড়ি ছিল। আমি যখন ছোট তখন ঢাকার পঞ্চায়েত প্রথার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি হয়ে গেছে। তখন ছিল পৌরসভা। কিন্তু অলিখিত ভাবে মহল্লায় মহল্লায় পঞ্চায়েত ঠিকই টিকে ছিল। সর্দারের জায়গায় থাকতেন পৌরসভার কমিশনার। তিনি মহল্লায় ছোটখাটো অপরাধ এবং সামাজিক বিরোধগুলোর মীমাংসা করতেন। কাদের সর্দারকে না দেখলেও মাজেদ সর্দারকে আমি দেখেছি। তাঁর বাড়ির বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে মাঝে মধ্যে গিয়েছি বাবার হাত ধরে। পুরান ঢাকার একজন বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে আমার বাবা অনেক অনুষ্ঠানেই দাওয়াত পেতেন।
আমার দাদার বাসভবনের নাম পেয়ারা হাউজ। দাদার গ্রামের বাড়ি বশিরহাটের পেয়ারা গ্রামে। সেই গ্রামের নাম অনুসারেই তার ঢাকার বাসভবনের নামকরণ। এই বাড়িটিকে আমরা চকের বাড়িই বলতাম। কারণ এটি বেগম বাজারের একেবারে শেষ মাথায়। চকবাজারের মোড়ে। জেলখানা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত। তখন চকের মোড়েই ছিল একটি পেট্রল পাম্প।
আমার বাবা তখন থাকতেন আলু বাজারে দাদার কেনা আরেকটি বাড়িতে। কারণ বেগমবাজারে তার জন্য বরাদ্দকৃত একটি মাত্র ঘরে স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। তাছাড়া তার নিজস্ব গাড়ি এখানে রাখাও অসুবিধাজনক। তাই দাদার নির্দেশে তিনি স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান নিয়ে ১৯৬৭ সালে চলে যান আলুবাজারের বাড়িতে। সেই বাড়িতেই ৭০ সালে আমার জন্ম। তবে আলাদা বাড়িতে থাকলেও বাবা-মা নিজেকে এই যৌথ পরিবারেরই বলে মনে করতেন। আমরা যখন গাড়ি নিয়ে বেগম বাজারে আসতাম তখন বেশিরভাগ সময় নাজিমুদ্দিন রোড দিয়ে জেলখানার সামনে দিয়ে ঢুকতাম এবং পেট্রল পাম্পে গাড়িটি রেখে দিতাম।
সেসময় নাজিমুদ্দিন রোডে বেশ কয়েকটি বড় প্রাসাদোপম বাড়ি চোখে পড়তো। একটি আবুজর গিফারি কলেজ। আরেকটি বেশ বড় পুরনো লোহার গেটওয়ালা বাগানবাড়ি। নাজিমুদ্দিন রোডে তখন এত ভিড়ভাট্টা ছিল না। সেখানে ছিল বেশ বড় বড় কিছু বাড়ি। ছোট ছোট দোকান। বাখরখানির অনেকগুলো দোকান ছিল। বাখরখানির দোকান পুরান ঢাকার সব মহল্লাতেই একটি বা দুটি থাকলেও নাজিম উদ্দিন রোডের বাখরখানির দোকানগুলো ছিল বিশেষ বিখ্যাত। এখানে ঝাল ও মিষ্টি বাখরখানি পাওয়া যেত। এখানে আরও কিছু বেকারির দোকান ছিল। সেসব বেকারিতে মিলতো ঢাকার বিখ্যাত নানখাটাই বিস্কুট, লাঠি বিস্কুট এবং ছোট ছোট চৌকা বিস্কুট। বিরিয়ানি ও তেহারির দোকানও ছিল। বড় বড় বাড়িগুলোর লোহার শিক লাগানো গেটের ফাঁক দিয়ে ভিতরের বাগান চোখে পড়তো। হাসিনা মঞ্জিল নামে একটি বাড়ির কথাও মনে আছে।
নাজিম উদ্দিন রোডের অজস্র পরিবর্তন হলেও এই বাড়িগুলো এখনও আছে।
জেলখানার প্রধান ফটক থেকে মোড় ঘুরে আমরা আসতাম জেলের প্রাচীরের পাশ দিয়ে চকের মোড়ে। জানি না জেলখানার পাশ দিয়ে আসার সময় বাবার মনে পড়তো কিনা তার কারাবাসের দিনগুলোর কথা।
আমার বাবা ভাষাসৈনিক মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ছিলেন চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সারির কর্মী এবং অন্যতম নেতা। তিনি ১৯৪৮ সালের প্রথম ভাষা আন্দোলনে অন্যতম সংগঠকও ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সাল থেকে ৫৫ পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী ছিলেন। তিনি তাঁর জেলজীবনের অসংখ্য গল্প আমাকে বলেছেন। সেসব না হয় পরে বলবো।
Leave a Reply