শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
আমি বেগম বাজারের মেয়ে পর্ব ২

আমি বেগম বাজারের মেয়ে পর্ব ২

শান্তা মারিয়া।।

বেগমবাজারের পেয়ারা হাউজ ও মরগুবা খাতুন

আমার বাবা স্কুলে ভর্তি হন ১৯৩১ সালে। অম্বিকাচরণ এমএ স্কুল। এই স্কুলবাড়িটি পরে বাবা আমাকে দেখিয়েছিলেন। সেটি ছিল আবুল হাসনাত রোডের প্রথম বাড়িতে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগার মানে জেলখানার প্রধান ফটকের ঠিক উল্টোদিকে। বাবার কাছে শুনেছি কিভাবে তারা কয়েকভাই ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে পুরান ঢাকায় স্কুলে আসতেন। মাঠের ভিতর দিয়ে সরু পথ ভেঙে তিনভাই( মেজভাই ওলীয়ূল্লাহ, সেজভাই যকীযূল্লাহ এবং আমার বাবা তকীয়ূল্লাহ) স্কুলে পৌঁছুতেন। দাদার গাড়ি ছিল। কিন্তু সেসময় ছোট ছেলেদের বাবুগিরিকে প্রশ্রয় দেয়া হতো না। তাই গাড়ি চড়ে স্কুলে যাওয়ার বালাই ছিল না।
পরবর্তিকালে শহীদুল্লাহ ৭৯, বেগম বাজারে একটি বাড়ি কিনে সেখানেই পারিবারিক বাসস্থান গড়ে তোলেন।
আমার বাবার(কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ) মুখে শুনেছি ৭৯, বেগম বাজারের দোতলা বাড়িটি দাদা কেনেন একজন বৃদ্ধার কাছ থেকে। সেই বৃদ্ধা ছিলেন ঢাকার একসময়ের প্রসিদ্ধ নৃত্যশিল্পী( ঢাকার ভাষায় মশহুর বাঈজি)। ঢাকায় বাইজিদের বসবাস ছিল পাটুয়াটুলি ও জিন্দাবাহার লেনে। বাইজিদের দাপটও ছিল প্রচুর। মোগল আমল থেকেই ঢাকার অভিজাতরা নৃত্যগীতের সমঝদার ছিলেন। এখানে বাইজিরা বিশাল বিশাল বাড়িতে বাস করতেন। তাদের অনেকেরই নিজস্ব একাধিক বড় বাড়ি ছিল। বড় ধনীদের বাড়িতে তারা নাচ গান পরিবেশন(মুজরা)করে প্রভূত সম্পদের মালিক হতেন। কিন্তু বিংশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে বাইজিদের অবস্থা পড়ে যেতে থাকে। কেউ কেউ নিজের টাকা পয়সা গুছিয়ে ধনী অবস্থা রাখতে পারলেও অনেকেই দরিদ্র হয়ে পড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও সময়ে সামাজিক শ্রেণি ও দৃষ্টিভঙ্গীরও পার্থক্য ঘটে। সাধারণ সৈনিক ও সাধারণ মানুষ বাইজিদের উচ্চাঙ্গের নৃত্যগীত দেখার চেয়ে অল্প টাকা খরচ করে সাধারণ যৌনকর্মীদের সেবা গ্রহণকেই লাভজনক মনে করতে থাকে। আর যাদের নৃত্যগীত দেখার ইচ্ছা তারা সিনেমা থিয়েটারে মনোযোগী হন। এছাড়া তখন গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগ। নিছক গান শোনার জন্য বাইজিবাড়িতে যাওয়ার আকর্ষণ থাকে না। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুব সমাজের কাছে বাইজিবাড়ির বিনোদন কদর্য রুচির প্রকাশ হিসেবেই গণ্য হতে থাকে। সব মিলিয়ে ঢাকার বাইজিদের অবস্থা তখন পড়তির দিকে। চল্লিশের দশকে দাদা এমনি এক দরিদ্র বাইজির কাছ থেকে বেগম বাজারের বাড়িটি কিনে নেন। চাঁদনী বাই নামে খ্যাত সেই বৃদ্ধা অনেক পরে মাঝে মধ্যেই আমার দাদীর কাছে আসতেন। তার পায়ের কাছে বসে যৌবনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতেন। দাদী তাকে প্রতিমাসে নিয়মিত আর্থিক সাহায্যও দিতেন। তার কাছ থেকে রূপার পানবাটা এবং আরও কিছু তৈজসপত্রও কিনেছিলেন। আমার কাছে মনে হয়, সেই দুস্থ মানুষটি শুধু সাহায্যের জন্যই আসতেন না, হয়তো তিনি নিজের জীবনের ঝলমলে দিনগুলোর স্মৃতির টানেই এই বাড়িটিতে ফিরে ফিরে আসতেন আলোক সন্ধানী পতঙ্গ হয়ে। চাঁদনি বাইকে আমি দেখিনি। তবে বড় ফুপুর মুখে শুনেছিলাম তার গল্প। কল্পনায় দেখতাম মলিন শাড়ি পরা শীর্ণকায় এক বৃদ্ধা যার গায়ের গৌরবর্ণ ঝুলেপড়া ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে পুরনো দিনের জৌলুস নিয়ে আসে। বেগম বাজারের বাড়িটি ছিল বিশাল। দুই মহলা। অন্দর মহলের দোতলায় গোল ঘোরানো বারান্দা। বারান্দায় দাঁড়ালে নিচে সিমেন্টে বাঁধানো উঠোন চোখে পড়ে। নিচের উঠোন থেকে সিঁড়ি উঠে এসেছে দোতালায়। নিচের তলায় জ্ঞানতাপসের বিশাল লাইব্রেরি। প্রায় পঞ্চাশ হাজার বই সেখানে। সেই লাইব্রেরিতে পাঠে নিমগ্ন বহুভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। নিচের তলায় আরও অনেক ঘর। সেখানে রয়েছে আশ্রিত, আত্মীয়, অনাত্মীয় পরিজন। রয়েছে বৈঠকখানা।
অন্দরমহলের নিচতলায় রান্নাঘর, ভাঁড়ারঘর, গৃহকর্মীদের থাকার ব্যবস্থা। প্রতিদিন ষাট সত্তরজনের রান্না হয় এই বাড়িতে।
শহীদুল্লাহর ৯ সন্তান। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সাত পুত্রের মধ্যে কয়েকজন এই বাড়িতে সপরিবারে বাস করেন। এই বড় যৌথ পরিবারের সর্বময় কর্ত্রী শহীদুল্লাহর পত্নী মরগুবা খাতুন। প্রৌঢ় বয়সেও তিনি দারুণ সুন্দরী। দুধে আলতা মেশানো টকটকে ফর্সা রং। তিনি রাশভারি, পর্দানশীন এবং কথা বলেন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার খাঁটি আঞ্চলিক ভাষায়।
এসবই আমার জন্মের অনেক আগের ঘটনা। তবে বাবার মুখে গল্প শুনে শুনে আমিও জাতিস্মরের মতো চোখের সামনেই দেখতে পাই বেগম বাজারের সেই জমজমাট বাড়িটিকে।
দাদীকে আমি দেখিনি। তবে শুনেছি তার অনেক গল্প। তিনি ছিলেন ভাসলে গ্রামের জমিদারের কন্যা। বাপের আদরের মেয়ে ছিলেন। দেখতেও ছিলেন দারুণ সুন্দরী। তার গায়ের রঙে ছিল গোলাপ ফুলের আভা। চোখের মণি ছিল খয়েরি রংয়ের। সেই মণির চারপাশ ও চোখের সাদা অংশটা ছিল হালকা নীল। দাদীর বংশে নাকি একবার পরী জন্মেছিল। সেটা সম্ভবত মিথ। তিনি জিন পরীর গল্প বলতে ভালোবাসতেন। তার বাবার নাকি পোষা জিন ছিল।
আমার বাবা বলতেন আমি আমার দাদীর মতন হয়েছি। কিন্তু আমি দাদীর ছবির সঙ্গে আমার কোন রকম মিল খুঁজে পাইনি। অনেক বাবাই নিজের মেয়ের মধ্যে হারানো মাকে খোঁজেন। আমার বাবাও তার ব্যতিক্রম নন। বাবা আমাকে কখনও সোজাসুজি ভ্যালিয়া নামে না ডেকে বলতেন ‘মামণি, মম অথবা ভ্যালেন।’
বেগম বাজার সম্পর্কে আমার যে স্মৃতি তা সত্তর ও আশির দশকের। পুরনো বাড়িটি খুব আবছা মনে পড়ে। সত্তর দশকের মাঝামাঝিতেই এই বাড়িকে ভেঙে চারতলা বিশাল ভবন নির্মাণ করা হয়।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD