পর্ব ৪
ধূপের ধোঁয়া ও বেলীফুল
শান্তা মারিয়া।।
বলছিলাম বেগম বাজারের কথা। এই এলাকাটি গড়ে উঠেছিল মোগল আমলে। এখানে অষ্টাদশ শতাব্দি থেকেই বাজার গড়ে ওঠে। এই এলাকায় বনেদি মানুষজনের বসতবাড়ি ছিল। ঢাকার নায়েবে নাজিম সরফরাজ খাঁর(১৭৩৯-৪০) কন্যা লাডলি বেগমের নামে এই এলাকার নাম বেগম বাজার। অন্যদিকে নায়েবে নাজিম নুসরাত জংয়ের মতে বেগম বাজার মসজিদের মুতাওয়াল্লি হাজী বেগমের নামে এই এলাকার নাম বেগমবাজার হয়। বেগম বাজার মসজিদও খুব বিখ্যাত। এই মসজিদে আমার দাদা নামাজ পড়তেন। বাবা ও চাচাদেরও এখানে জুম্মার নামাজ পড়তে যেতে দেখেছি। ঈদের নামাজ অবশ্য এই মসজিদের চেয়ে চকের জামে মসজিদেই বেশি পড়তেন তাঁরা।
সব সময় যে আমরা নাজিউদ্দিন রোড দিয়ে বেগম বাজারে আসতাম তা নয়।
অনেক সময়েই সাত রওজা পার হয়ে বেগম বাজারে আসতাম আমরা রিকশায় চড়ে। কাছেই হোসেনি দালান। শুনেছি মধ্যযুগে সাত রওজায় বাস করতেন এক দরবেশ।তার কবর এখনও এখানে রয়েছে রাস্তার পাশেই, বাঁধানো এবং শিক দিয়ে ঘেরা। সেই কবরে সন্ধ্যায় আগরবাতি জ্বালিয়ে দিত এলাকার লোকরা। রিকশায় চড়ে যাওয়ার সময় দেখতাম কবরে জ্বলছে আগরবাতি।
বেগম বাজারের রাস্তায় তখন দেখতাম একটি বড় একতলা বাড়ি। সামনের দিকে বাঁশের বেড়া ও খড়ের ছাউনি। মাটির হাড়ি পাতিলের স্তূপ। রাস্তা থেকেই দেখা যেত বাড়িটির ভিতরের কাঁচা উঠোন ও অন্দর মহলের আভাস। এটি ছিল কুমোরের বাড়ি। সত্তর দশকের শুরুর দিকে পুরান ঢাকার অনেক বাড়িতেই গ্যাস সংযোগ ছিল না। তখনও লাকড়ি ও কয়লার চুলায় রান্না হতো অনেক বাড়ি্তে। কেরোসিনের চুলাও ছিল। ইলেকট্রিক স্টোভ আর গ্যাস স্টোভও ছিল। তখন অ্যালুমিনিয়ামের হাড়ি ব্যবহার হলেও মাটির হাড়ির জনপ্রিয়তা বজায় ছিল। অনেকে বলতেন, মাটির হাঁড়িতে রান্না করা নাকি ভালো। আর ফ্যান গালার জন্য মাটির মালসা তো ব্যবহার হতোই। সেইসঙ্গে মাটির কলসীর ব্যবহারও ছিল দেদার। এজন্য পুরান ঢাকার অনেক মহল্লাতেই কুমোরের বাড়ি ও দোকান থাকতো। নিত্য ব্যবহার্য মাটির হাড়ি পাতিল ও অন্যান্য সামগ্রী এই কুমোরের দোকান থেকেই কেনা হতো। ঢাকার রায়ের বাজারে ছিল বিশাল কুমোরপাড়া। সে গল্প আরেকদিন হবে।সত্তর দশকে আমি বেগমবাজারে দেখেছি বেশিরভাগ আবাসিক বাড়ির নিচের তলায় দোকানঘর। পুরনো সব ভবনের সামনের দিকটা একটু মেরামত করে দোকানঘর ভাড়া দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটা ছিল স্পঞ্জের আর প্লাস্টিকের স্যান্ডেলের দোকান। সে সময় স্পঞ্জের আর প্লাস্টিকের স্যান্ডাল খুব জনপ্রিয়। আরও বিক্রি হতো মোটা প্লাস্টিকের তৈরি ব্যাগ। সেগুলো সাধারণত মিউনিসিটপালটির স্বাস্থ্যকর্মীরা(স্থানীয় ভাষায় টিকাওয়ালি) ব্যবহার করতেন। আরও দেখেছি পুরনো শিশি বোতলের ভাঙারির দোকান, চুড়ির দোকানও ছিল। অবশ্য চুড়ির জন্য বিখ্যাত হলো চক সাকুর্লার রোডের দোকান আর চুড়িহাট্টা। বেগমবাজারেও কিছু কিছু চুড়ি ও ইমিটেশনের গয়নার দোকান ছিল। মৌলভি বাজারের এক্সটেনশন হিসেবে এখানেও চাল ডাল, মশলা পাতির দোকান, বেনের দোকান ও পসারীর দোকান ছিল(এসব দোকানে শুধু মাত্র বিভিন্ন রকম মসলা বিক্রি হয়)।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে দেখতাম পুরান ঢাকার দোকানে দোকানে আর বাসাবাড়িগুলোতে ধূপ জ্বালানোর পালা চলছে। গলির মোড়ে মোড়ে বিক্রি হতো বেলফুল। বিশেষ করে জয়কালী মন্দির রোড, ঠাঁটারি বাজার, বনগ্রাম লেন আর এদিকে বংশালের মোড় ও আগামসি, আগা সাদেক লেনের মোড়ে বেলফুল বিক্রি হতো। আমার স্মৃতিতে শৈশবের সন্ধ্যা মানেই বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধূপের ধোঁয়া আর বেলফুলের সৌরভ মেলানো অদ্ভুত এক সময়ের কথন।
Leave a Reply