শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:২৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
কলিকাতার নামমাহাত্ম্য

কলিকাতার নামমাহাত্ম্য

অরিন্দম দেব (বিদূষক অরিন কবি)

কবি হয়ে বড্ড আমার ছিলো মনের আশ
ছন্দে গেঁথে শোনাবো কলকাতা নামের ইতিহাস

পৌরাণিক ব্যাখ্যাঃ-

পৌরাণিক ব্যাখ্যা দিয়ে শুরু যদি করি,
“ কলির ঠাকুর “ হতে কলকাতা, ধরতে কেন নারি?
“ক্রোধের” সে ঔরস গেল তার ভগিনীরই গর্ভে
“ হিংসা তারই স্ত্রী হয়ে যে হলেন সর্বাংসর্বে।।
তাদের পুত্র জন্মালে হায়, “ কলি” গো তার নাম,
তারই ভগিনীর পতি হয় দ্বিরুক্তিভরা কাম!
এক পুত্র তাদের ভীত, তাই হয় নাম “ভয়”
আর কন্যা তাদের আঁধারে রয়ে, মৃত্যু সে নাম লয়!

প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাঃ-

প্রত্নতত্ত্বে লেখা আছে পুকুর খুঁড়তে গিয়ে
খাপড়া ফলের বীজ যে ছিল সেথায় গো লুকিয়ে!
বোঝা গেল অনেক সেরম,গাছও বটে ছিলো,
এখান থেকেই যায় বোঝা, কেউ শহর গড়েছিল।।
এই সে শহর স্থানের ইতিহাস বলে সে কথা,
বসতি যেথা অনেক প্রাণের সাজাই যদি তথা –
তবু সত্যি বলতে, বুঝি এই যে সকল উক্তি
প্রমাণ বিনা অনুমানই তা, অকাট্য সে যুক্তি।।
পাওয়া গেল খনন করে মাটি ও ধাতুর পাত্র,
হয়তো বোঝায়, ধনী ও দীন, তখনও সর্বত্র!
আঠারোটি ধাতুমুদ্রা মেলে কালীঘাটে
তিনটি চন্দ্রগুপ্তের, বাকি? বিষ্ণুগুপ্তের রটে!
তার মানে কি এ শহর সে গুপ্ত রাজেও ছিল?
ধরে নিলেও বটেই তো তা, সে যে তথ্যই রইলো?
হতে পারে পর্তুগিজ বা কোনো দিনেমারী,
ঘুরতে এসে কালীঘাটে, তা গিয়েছিলো ছাড়ি!
এশিয়াটিক সোসাইটির কোন্ এক দ্বারবান,
দেন তা জমা জাদুঘরে, না বুঝে তার মান!

পূরাকালের পাঁচালী মতঃ-

পূরাকালের পাঁচালী সব পঞ্চশতকেরই
বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে বর্ণনা আছে তারই।।
মুকুন্দরাম – চণ্ডীতেও তা ছন্দে রাখেন ধরি
এরম তথ্য আকবরেরও, বলে, আইন – ই – আকবরী!
এই মোঘল সম্রাট সেও, রোজনামচায় গো তার
কলিকাতার নামোল্লেখ বটেই, করেছিলেন বারম্বার!!
এইভাবেই চিন্তনেতে সৃষ্ট কলিকাতা,
কালস্রোতে পড়লো বাঁধা, তৈরি হলো গাঁথা ।।

স্থানীয় লোককথায়ঃ-

স্থানীয় লোকের কথায় এবার আসাই যাক বটে
কলিকাতার আদি স্থানটি তো সে গোবিন্দপুর রটে!
গোবিন্দ দত্তেরই “দত্তক” সে নাম জুটেছিল
প্রতাপাদিত্য – বসন্তরায়ের করণিক যে ছিল।
ভক্ত তিনি ছিলেন প্রভুর, স্বপ্নে যে দেখলো
শ্রীগোবিন্দের সেথা গো তার দরশণ মিললো।।
নারায়ণ স্বপ্নে বলেন, কালীঘাট অঞ্চলে
তার আদেশে সেথা যেন, খননকর্ম চলে।।
মাটি খুঁড়ে বেরোলো এক ঘড়া দামী মোহর –
যেন কানুর কৃপা বর্ষে এই ধনেরই ওপর।।
সেই ধনেই গড়া গেল ভিত কলকাতার হেন!
আর গোবিন্দপুর গ্রাম জন্মালো , আজ ময়দান যেথা জেনো।।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের অধস্তন কিছু পুরুষ,
রাজ – জমিদার নয় বটে,শেঠ নামেতে পৌরুষ।
তাদের কূলের যে দেবতা, গোবিন্দ জিউ যিনি,
বলেন তারাই, সে নামেরই পশ্চাতে বটেই
তিনি।।
হাটখোলার দত্তবাবু, কী মিত্র কুমোরটুলি
বাবু গোবিন্দই পূর্বতন বলে, সে নামই দেন তুলি!

শব্দের বুৎপত্তি অনুসারেঃ-

শব্দেরই বুৎপত্তি তা সে, অন্য কথা কয়
বুনন সূতা ও নাচের নটী, সূতানুটি নাম লয়।
আবার জাহাঙ্গীরের রাজকালে, মানসিংহ রাজা
লক্ষ্মীকান্তে জমি দিলেন, তিনি ছিলেন গো সু – প্রজা।।
এই লক্ষ্মীকান্ত, সাবর্ণদের পূর্বপুরুষ জানি
বড়িষারই জমিদার সে, আমরা সকল মানি।।
শ্যামরাই হতেন বটে কূলদেবতা তার
সেই মন্দিরের ওপর ছায়া দিতো, চন্দ্রাতপ বা চাদর।
এই চন্দ্রাতপই ছত্রসম দিত স্নিগ্ধ ছায়া
পূজা অন্তে সাঁঝে সেথাই হরির লুট ভায়া!
হরি – কৃষ্ণ প্রসাদ লুট থেকেই “ছত্রলুট “
সেখান হতেই “ ছত্রলুটি “ আর সেই তো “ সূতালুট “
“ সূতালুট” ই শেষমেষ রূপ, নিলো “ সূতালুটি “
লোকমুখে তাই গিয়ে দাঁড়ালো বর্তমানের “ সূতানুটি“!!
এরকম দেখলে পরে ইতিহাস যা বলে,
জোব চার্ণোক কলকাতার জনক, এ তথ্য যায় টলে !
চার্ণোক সাহেব বলেন, সুতানুটিই সে কলকাতা,
শেকড় সেখান হতেই শুরু, ইতিহাসের গাঁথা!
সতেরশো শতকেরই, সাতাশ মার্চ অবধি,
সূতানুটি কোম্পানিরই হেড আপিস নিরবধি।।
চিঠিপত্রেরই আদান ও প্রদান, সে স্থান নামেই ছিলো,
হঠাৎ এপ্রিল হতে নাম, কলকাতায় পাল্টালো।।

ব্রিটিশ শাসককূলের সেপাই গান এক গাইতো,
তারই সাথে খানাপিনা – নাচেই মাততো।।
“ কালী গয়ী কলকত্তা, জিনকি পূজাকে ফিরিঙ্গি
বঙ্গালী কো মুল্ক – ধন – দৌলত,
দখল করলু রে বজরঙ্গী! “

(অনুবাদে)
“Kali lost Her glamour
She’s from Kolkata/Calcutta therein
Worshipped by the Bengali Kin
Whose wealth was well plundered
By Firinghees without and within ! “
এই কালী মতে কলিকাতা “ কালী ওঁয়াহা থা! “
দুয়ে মিলে সন্ধি করেই, সে হলো কলকাতা!

কিন্তু সিংহাসনচ্যুতা হলেন হায় মা কালী,
কেমন করে তা হলো এবার, সে ইতিহাস বলি!

উত্তরেতে বেহালা,তথা দক্ষিণে দক্ষিণেশ্বর
এই বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে কালীক্ষেত্র ছিল অপার।।
রাণীমাতা মহাকালী অধিষ্ঠাত্রী দেবী,
তান্ত্রিকেরা করলো হরণ, পাই যে তারই ছবি।।
পলাতক তান্ত্রিকগণ মায়ের ভার না নিতে পেরে,
নামালেম সেই মূরতী, দক্ষিণেশ্বরে।।
এই দক্ষিণেশ্বরই ছিলো তখন, প্রায় বাঙালির রাজধানী,
পরে সেথাই মন্দির গড়েন, রাণীমা রাসমনী!
এ তথ্য ভিত্তিহীন, তথা অলিখিতই বটে,
এমন সরস কাহিনি কেবল লোকমুখেই রটে !!

আবার এও বলা যায় “কেল্লা” হতেই এলো “কলিকাতা”
মানতে কজন পারবে বলো? বলবে, বলছি যা তা !
ফোর্ট উইলিয়ামই সে কেল্লা, রাধাকান্ত দেবে কয়,
শোভাবাজারের রাজা তিনি জেনো গো নিশ্চয় !!
একই বার্তা শোনালেন সে গায়ক নিধুবাবু
টপ্পাসুরেই রামনিধি করেন নিন্দুকগণে কাবু।।

আরেকরূপে “কলি” হলো চুনা কিম্বা লাইম
“কাতা” অর্থে ভাটি বোঝায়, ইংরাজি “ভ্যাট” ফাইন!
কলকাতায় গুদাম ছিলো এই চুনের ভাটি ভাটি
আদিগঙ্গা উপকূলের জেলে রাখতো পরিপাটি।।
সেইসব জেলেগণই বটে, মাছের চেয়ে বেশি
শামুক ঝিনুক ধরা নিয়েই করতো রেষারেষি।
পুড়িয়েই তা করতো তয়ের কলিচুন বা চুন,
সেই “কলি” হতেই কলিকাতা নামের গান বা গুণ।।
অবশেষে তর্ক সকল হলোই অবসান
এই ইতিহাস করলে গ্রহণ, কলকাতা কর্পোরেশন।।

কালী তন্ত্র মতঃ-

কালী তান্ত্রিক মত সে তো অন্য কথাই বলে
দিনেমারি বলে সে নাম “গৌল গাঁথায়” চলে।।
গাঁথা থাকে মালায় যেমন পূঁতি কিম্বা বলের
“গৌল” হলো সেরূপ গোলক খুলি নরকঙ্কালের!
অর্থাৎ কিনা তন্ত্রভূমি ছিলো কলিকাতা,
নরভূমেই শ্মশান ছিলো, কে মানবে এ কথা?
ধর্মভীরু ভক্ত কালীর মানলেও এ কথা
যুক্তিবাদী বাঙালি কি বিশ্বাসে এ গাঁথা?

পরিশিষ্টে বলছি কবিঃ-

ছন্দটি মেলাতে গিয়ে রাখতে তাল ও লয়,
কাব্যে বর্ণিত ভাষার কিছু, গুরুচন্ডালীই রয়!
নামমাহাত্ম্য বর্ণনাতে এটাই হলো ভীত
তাই দর্পহীন চাইছি ক্ষমা,হে সকল ভাষাবিদ!
নানারূপে, নানারঙ্গে দিলাম পরিচয়
কলিকাতার নামরহস্য এমন বটেই রয়।।
অনেকটুকুই করলাম নষ্ট, আপনাদের সময়,
ক্ষমাপ্রার্থী বিদূষক অরিন নিলাম গো বিদায়।।

তথ্যপঞ্জীঃ-

১] নীরদবরণ হাজরা,”কলকাতা,ইতিহাসের দিনলিপি” – অখণ্ড সংস্করণ (এপ্রিল ১৯৯৫),পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, দ্বিতীয় অধ্যায় অষ্টাদশ শতক

২] Thompson & Garrat,” The Rise And Fall of British Rule.in India
৩] হরিহর শেঠ, “ প্রাচীন কলকাতা পরিচয় “
৪] A.K.Roy, “ A Short History of Calcutta “
৫] P.T.Nair, “Calcutta, Origin of It’s Name, Calcutta 1985
৬] শ্রীপান্থ, “ কলকাতা “, আনন্দ পাবলিশার্স, দশম মুদ্রণ,অক্টোবর ২০১০

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD