ফুল্লরা ফ্লোরা।।
জোছনার নরম সাদা আলোয় প্রকৃতি যখন স্নান করে, অদ্ভুত এক কষ্টের অনুভূতিতে ভরে ওঠে অদৃজার মন।
জোছনার আলোর সাথে জড়িয়ে আছে তার কিশোরী জীবনের স্মৃতি। যখন পূর্ণিমা রাতে আলোয় আলোকিত হয়ে যেত চারপাশ তখন ওর ঘুম আসত না। সোনালি চাঁদের আলো হাতছানি দিয়ে ডাকত। সে ছুটে চলে যেত ছাদে। ছাদের গাছপালার সাথে জোছনার আলো মিশে মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি হতো। অনেক অনেক সময় ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মত উফভোগ করত অদৃজা। পূর্ণিমার সময়টাতে তাই প্রতিদিনই সে ছাদে বেড়াত, গুণ গুণ করে গান গাইত।
হঠাৎ একদিন লক্ষ করল আদৃজা, কে যেন পায়চারি করছে পাশের বাড়ির ছাদে। ভালো করে খেয়াল করল সে, আরে এতো সেই ছেলেটি যাকে বাইরে যাওয়ার সময় বাড়ির গেটে দেখেছিল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
এই জোছনার আলোতেও একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। অবাক হলো অদৃজা, লজ্জাও পেল একটু। তাড়াতাড়ি সিড়ি বেয়ে নেমে গেল নিচে। কিন্তু সেই মুগ্ধ দৃষ্টি বারবার ভেসে ওঠতে লাগল তার মনের গভীরে।
কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দেখার জন্য তিন বান্ধবী গেল ডিপার্টমেন্টের অফিসে। তিনজনই চান্স পেয়েছে, তাই আনন্দটা একটু বেশিই ছিল। হুল্লোড় করে নামতে গিয়ে ধাক্কা লেগে গেল একজনের সাথে। অদৃজা মুখ তুলে দেখে, পাশের বাসার সেই তিনি! অন্তুর সাথে ধীরে ধীরে পরিচয়, আলাপ ও ঘনিষ্ঠতা। এরপর প্রায় প্রতিদিন দিনে ভার্সিটি আর রাতে ছাদে জোছনার আলোয় দেখা হতো দুজনের। দুজনেই স্বপ্ন দেখত, কোনো একদিন তারা ভরা পূর্ণিমায় নৌকায় চড়ে জোছনার আলো উপভোগ করতে যাবে।
সেমিস্টারের পড়াশোনা, পরীক্ষার চাপ সবকিছুর ব্যস্ততায় বেশ কিছুদিন ছাদে যেতে পারেনি অদৃজা। পরীক্ষার শেষে খুশি খুশি মনে ছাদে গেল সে। অন্তুও অপেক্ষায় ছিল, জমে থাকা অনেক কথার মাঝে হারিয়ে গেল দুজনে। অন্তু জানাল, উচ্চতর পড়াশোনার জন্য অষ্ট্রেলিয়ার এক ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে সে। শুনে খুব খুশি হলো অদৃজা কিন্তু পরক্ষণেই মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর! অন্তুকে না দেখে, ওর সাথে কথা না বলে কীভাবে দিন কাটবে তার!
অদৃজার মন ভালো করার জন্য অন্তু যাওয়ার আগে ওকে একটি কাঁঠাল চাঁপা ফুলের চারা উপহার দিল। খুশি হলো অদৃজা।কাঁঠাল চাঁপা তার প্রিয় ফুল। সে খুব যত্ন নিয়ে ছাদের একটি ড্রামে চারাটি লাগালো। কিছুদিনের মধ্যেই বেশ বড়সড় হয়ে উঠল চারাগাছটি। প্রতি রাতে ছাদে গিয়ে গাছে পানি দেয়ার সময় অন্তুর সাথে মোবাইলে কথা বলা তার জন্য একটি নিয়ম হয়ে গেল। ধীরে ধীরে কাঁঠাল চাঁপা গাছের ফুল এলো, মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে গেল চারপাশ! ফুলের ঘ্রাণে মন ভালো হয়ে যায় অদৃজার, শুধু অন্তুর কথা মনে পড়ে। মোবাইলে ফুলের ছবি পাঠায় অন্তকে, অনেক কথা হয় দুজনের। পড়াশোনা শেষে অন্তুর দেশে ফেরার সময় হয়ে এলো। অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলো অদৃজা।
মাঝে বেশ কিছুদিন যোগাযোগ সম্ভব হলো না অন্তুর সাথে। অদৃজার ভালো লাগে না, মন খুব খারাপ হয়। কিছুদিন পর হঠাৎ খুব ঝড় শুরু হয় ভোররাতে। প্রচন্ড শব্দে ঘুম ভেঙে যায় অদৃজার। ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই ছাদে ছুটে যায় সে, দেখে ড্রামসহ উল্টে পড়ে আছে তার অতি প্রিয় কাঁঠাল চাঁপা ফুলের গাছটি! কান্নায় ভেঙে পড়ে অদৃজা। অনেক কষ্টে গাছটিকে সোজা করে ড্রামের ভেতর। কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরে আসে, বিছানায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে সে।
ভোর হয়ে যায়, মা দরজায় টোকা দিয়ে ডাকেন, বলেন একজন ভদ্রলোক এসেছেন অষ্ট্রেলিয়া থেকে, দেখা করতে চান ওর সাথে। অদৃজা বের হয়ে দেখে, অপরিচিত এক ভদ্রলোক বসে আছেন ড্রইং রুমে।ওকে দেখে লোকটি উঠে দাড়ায়, জানায় সে অন্তুর বন্ধু, এক সাথে পড়াশুনা করেছে ওরা। তারপর একটু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে হাতটা বাড়িয়ে দেয় অদৃজার দিকে, তার হাতে একটি খাম-খামের চারপাশে কালো বর্ডার।
Leave a Reply