-লোকমান হোসেন পলা।।
ভূমিকা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সময়ের পরিক্রমায় অনেক আন্দোলন ও ধারা সৃষ্টি হয়েছে—রোমান্টিক কবিতা, আধুনিক কবিতা, স্বদেশচেতনা, বা আত্মসন্ধানমূলক সাহিত্য। কিন্তু একবিংশ শতকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তি মানবচেতনার অঙ্গ হয়ে উঠেছে, সেখানে এক নতুন সাহিত্যধারার প্রবর্তন করেছেন কবি হাসনাইন সাজ্জাদী—“বিজ্ঞান কবিতা”। হাসনাইন সাজ্জাদী একজন সব্যসাচী লেখক।
তিনি শুধু একজন কবিতা বিজ্ঞানী নন; তিনি একাধারে বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাবিদ, সংস্কৃতিচেতা, সমাজ বিজ্ঞানী, সমাজচিন্তক, বিজ্ঞানবাদী রাষ্ট্রচিন্তক এবং সিলেটের আধুনিক সাহিত্যচর্চার এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকারী।
বিজ্ঞান কবিতার প্রবর্তন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বিজ্ঞান কবিতা এমন এক সাহিত্যধারা, যেখানে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ, জিনতত্ত্ব, কোয়ান্টাম চিন্তা ও মানবতার সহাবস্থান এক কাব্যিক ভাষায় প্রকাশিত হয়। হাসনাইন সাজ্জাদী এই ধারাকে বিশ্বমুখী করেছেন তাঁর লেখায়।
তিনি প্রমাণ করেছেন, বিজ্ঞান পরীক্ষাগারের বিষয়। তবে কবিতার আবেগে যখন তা যুক্ত হয়, তখন তা নতুন রূপ পেয়ে ফলিত বিজ্ঞানের শাখা কবিতা বিজ্ঞান হয়। কল্পনা, অনুভূতি ও মানবিকতার এক অনন্য রূপান্তর কবিতাবিজ্ঞান। কবিতাবিজ্ঞান অনুসরণ করে লেখা কবিতায় যেমন যুক্তির দীপ্তি থাকে তেমনি থাকে আবেগের নান্দনিকতা।
বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদীর অসংখ্য লেখা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অনলাইন জার্নাল ও সাহিত্য মঞ্চে আলোচিত হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক কবিতাকে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ সৃজনের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই স্বীকৃতিই তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার এক বিশেষ প্রতিনিধি করে তুলেছে। অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠনের সহসভাপতি (গবেষণা ও মূল্যায়ন) পদ লাভ ও বিজ্ঞান কবিতার গবেষণা পরস্পর যুক্ত ও বাংলা সাহিত্যেরবঐতিহাসিক ঘটনা।
সিলেটের সাহিত্য ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
সিলেটের সাহিত্য ঐতিহ্য দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ—শাহ জালাল ও তাঁর সুফি উত্তরাধিকার, শ্রী চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব আন্দোলন, এ ধারার অনুসরণে গোলাম হুসনের হাতে জন্ম বাংলা মুসলিম মরমীবাদ, দীন ভবানন্দের হরিবংশ কাব্য, হাসন রাজার মরমি সাহিত্য, গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলন, দইখুরা, রাধা রমন, শীতালং শাহ, ইয়াসিন শাহ, আমির সাধু, শাহ হাজী গোলাম মোস্তফাদের মরমী ও লোকসংস্কৃতির ধারা, অন্ধ কবি আর্জুমান্দ আলীর উপন্যাস হয়ে গণকবি দিলওয়ার ও মোফাজ্জল করিমের আধুনিক কবিতার উত্তর প্রজন্ম বিজ্ঞানকবি তিনি। সিলেটি প্রজন্মের কবি-চিন্তকদের এক নিরবচ্ছিন্ন ধারায় উঠে এলেও তিনি বিজ্ঞান কবিতার আন্দোলন ও থিয়োরি দিয়ে তিনি এখন আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও গবেষণা ব্যক্তিত্ত্ব। উত্তর
আধুনিক ও উত্তর ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারী হিসেবে বিশ্ব সাহিত্যে হাসনাইন সাজ্জাদী নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। মৌলিক সাহিত্য করেন তিনি। তাঁর চর্চা নিজস্ব ঘরানার। পরের ধনে পোদ্দারি করেন না তিনি। অন্যের কাজের উপর গবেষণা করে তিনি গবেষক বা বিষারদ নন। নিজেই নিজের নেতৃত্বে এবং তত্বে পথ তৈরি করেছেন তিনি। তাই পুরনো মালের ব্যবসায়ীদের কাছে তাঁর সে রকম অবস্থান হয়নি। না হলেও বাংলা সাহিত্যের ভাঙারি ব্যবসায়ীদের ভীড়ে তিনি খাঁটি স্বর্ণব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা দিয়ে চলেছেন।
তাঁর সাহিত্যচেতনায় সিলেটের প্রকৃতি, নদী, বৃষ্টি ও আধ্যাত্মিকতা যেমন জায়গা পেয়েছে, তেমনি স্থান পেয়েছে বিজ্ঞানের নিউরন, মেশিন লার্নিং, অ্যালগরিদম ও মহাকাশযাত্রার কাব্যিক উপমা। শেকড় থেকে শিখর জুড়ে তিনি রয়েছেন।
এই দ্বৈত স্রোত—প্রকৃতি ও প্রযুক্তি, মরমিয়তা ও বিজ্ঞান—তাঁর লেখাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিজ্ঞান ও মানবতার সংলাপ
হাসনাইন সাজ্জাদীর কবিতায় এক গভীর প্রশ্ন উঠে আসে—“মানুষ কি মেশিনের প্রভু, না তারই সৃষ্ট প্রতিরূপ?”
এই প্রশ্নই তাঁর কবিতাকে কেবল সাহিত্য নয়, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় নিয়ে আসে।
তিনি বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান যদি মানবতার জন্য না হয়, তবে তা অর্থহীন। তাই তাঁর কবিতায় প্রযুক্তি মানবিকতার পরিপূরক রূপে আবির্ভূত হয়।
তাঁর বিজ্ঞান কবিতা যেমন ভবিষ্যৎ সমাজের নৈতিক প্রশ্ন তোলে, তেমনি তরুণ প্রজন্মকে চিন্তার নতুন দিগন্তে আহ্বান জানায়।
বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল মানবতা
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হাসনাইন সাজ্জাদীর লেখার প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। তাঁর “বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন” আজ শুধু একটি সাহিত্যধারা নয়, বরং এক বিশ্বচিন্তার অংশ হয়ে উঠেছে। জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্ট্যাডিজে তিনি যখন ‘বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান কবিতা’ থিয়োরি উপস্থাপন করেন তখন তা বিশ্বে ছড়িয়ে যায়। উত্তর আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা রাজ্যের ইভেন্ট হরাইজন ম্যাগাজিন তখন ৫০০ ডলারের বিজ্ঞান কবিতার প্রতিযোগিতার আহবান করে। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ এপ্রিল আমেরিকার কবিতার মাস হিসেবে নিউজ উইক ম্যাগাজিন তার অনলাইন সংখ্যাকে বিজ্ঞান কবিতার সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করে। সবই ঘটছে হাসনাইন সাজ্জাদীর বিজ্ঞান কবিতার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে।
তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের চেতনাকে সম্প্রসারিত করছে, মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে সীমাহীন করছে—এবং এই বাস্তবতা কবিতার ভাষায় নতুন বিপ্লব ঘটাচ্ছে।
তাঁর সাহিত্য এই নতুন যুগের ডিজিটাল মানবতা (Digital Humanity)-র কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখা গ্রন্থগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় তিনি কত বৈচিত্র্য বিষয় নিয়ে লিখেছেন। টমি মিয়ার রান্না থেকে শুরু করে পূর্ববঙ্গে হাজী মহসিনের অবদান, সিলেটের লোকসাহিত্য থেকে মৌলভীবাজারের মুক্তিযুদ্ধ এবং শিশুতোষ বিজ্ঞান সিরিজ, বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের গল্প, সাংবাদিকতা এবং কবিতা বিজ্ঞানের নানাদিক তো আছেই।
হাসনাইন সাজ্জাদী’র লেখা উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ তালিকা নিম্নে দেয়া হলো:
১. এখানে একদিন (কবিতা), ২. সাংবাদিকতার অ আ ক খ,৩. টমি মিয়ার মজার রান্না,৪. সিলেটের লোকসাহিত্যে ব্যাক্তিমানস ও সমাজ, ৫. ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্তদিবস,৬. সময় বদলে গেছে,
৭. পূর্ববঙ্গের শিক্ষাদূত হাজী মুহম্মদ মহসীন,৮. একশ কোটি তেজস্ক্রিয়তা, ৯. বিজ্ঞান কবিতার রূপরেখা,
১০. জাপানে বঙ্গবিদ্যা ও বাংলাদেশের বিজ্ঞান কবিতা,১১. ভালোবাসার বড় কিছু, ১২. সহজ সাংবাদিকতা কেমন করে,১৩. হে স্বপ্ন হে বিজ্ঞান কবিতা, ১৪. ভালোবাসার হার্ডডিস্ক.১৪. প্রেম একমুঠো নীল,১৫. ছোটদের বিজ্ঞানবাদ,
১৬. বিজ্ঞানবাদের কাব্যতত্ত্ব, ১৭. মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, ১৮. আমাদের পৃথিবী, ১৯. চলো চাঁদে যাই, ২০. রহস্যে ভরা সমুদ্র তল,২১. প্রকৃতি ও পরিবেশ, ২২. ছন্দ ছড়ায় বর্ণমালা, ২৩. কবিতাবিজ্ঞান,২৪. কবিতায় বিজ্ঞান অ-বিজ্ঞান, ২৫. বিজ্ঞানধর্ম মননে অন্বেষণে, ২৬. বিজ্ঞান কবিতার রোমান্টিকতা ও বিবিধ, ২৭. জাপান ভ্রমণলিপি,২৮. রোবটের গল্প,২৯. ভিনগ্রহের এলিয়েন,
৩০. আবিষ্কার যখন মজার গল্প,৩১. বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী,৩২. বিজ্ঞান কাব্যতত্ত্ব ও সাবলীল ছন্দ, ৩৩. পাশের বাড়ির সেই রোবট, ৩৪. যত এডভেঞ্চার,
৩৫. মৃত্যুর কোনো স্বাদ নেই, ৩৬. চোখগুলো একদিন বাড়িতে নিয়ে যাবো শোকেসে তুলে, ৩৭. কমলা রঙের রোদ, ৩৮. পৃথিবী বদলে দেয়া যত আবিষ্কার,৩৯. অর্থনৈতিক বিজ্ঞানবাদ, ৪০. সভ্যতা, পূঁজিতন্ত্র ও বিজ্ঞানবাদ এবং ৪২. বিজ্ঞান শিক্ষা সম্প্রীতি। প্রকাশের মিছিলে রয়েছে ৪৩, ভাষার অমিয়সুধা, ৪৪. এশিয়ার পথেপ্রান্তরে, ৪৫. সিলেটের বাঙালিতত্ত্ব, এবং ৪৬. জালালাবাদের সাহিত্য সংস্কৃতি।
উপসংহার
বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী কেবল সিলেট নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের এক নবযুগের সূচনাকারী। তিনি সেই কবি, যিনি বিজ্ঞানকে মানবিকতার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছেন, যিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও হৃদয়ের স্পন্দন খুঁজেছেন কবিতায়। হাসনাইন সাজ্জাদীর জন্ম সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার জুড়ীতে। দাদা লোকসাহিত্যিক আমির সাধুর উত্তরাধিকার অভিজ্ঞতায় তিনি ছড়াকার ও পরে সাংবাদিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু প্রকৃতির বৈচিত্র্য লীলা ও ভাবনায় তিনি সহসাই কবিতার বাঁক পরিবর্তনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
তাঁর হাতে বাংলা সাহিত্য এক নতুন মহাবিশ্ব পেয়েছে—যেখানে শব্দ ও সমীকরণ, মানবচেতনা ও প্রযুক্তি একে অপরের পরিপূরক।
সিলেটের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হয়েও তিনি সময়ের সীমানা অতিক্রম করে গেছেন—বাংলা থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে, মানবতা থেকে মহাবিশ্বে।
সত্যিই, হাসনাইন সাজ্জাদী আজকের পৃথিবীর একজন সব্যসাচী লেখক, গবেষক ও কবিতাবিজ্ঞানী। তাঁর হাতেই “বিজ্ঞান ও সাহিত্য একসূত্রে গাঁথা কণ্ঠস্বর”।
Leave a Reply