আসমা চৌধুরী।।
আমি আর রতন একসাথে বড় হই,একই ক্লাসে পড়ি।তখন বিকেলগুলো কাবাডি কিম্বা ফুটবলের মাঠে কাটিয়ে খালের পানিতে সাঁতার কেটে হাসতে হাসতে কাটাতাম।আমাদের সাথে আরো থাকতো বজলু,মমিন ও কাদের।আমাদের সাথে নবম শ্রেণিতে পড়তো আয়শা বেগম।রতনই প্রথম বলে, আমি যদি মুসলমান হতাম তাহলে আয়শাকে বিয়ে করতাম।রতনকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও আমি বুঝতে পারি, আয়শাকে স্কুলে না দেখলে আমার কেমন যেন লাগে।আয়শাই আমাদের ক্লাসে সবচেয়ে ভালো দেখতে।সাদেক স্যার বলতো আয়শার হাসি সুচিত্রা সেনের মতো।ক্লাস টেনের ছেলেরা স্কুলের গেইটে দাঁড়িয়ে থাকতো আয়শাকে একনজর দেখার জন্য।বাথরুমের দেয়ালে লিখে রাখতো আয়শা I Love You।
বজলু একদিন আয়শাকে একটা কলম উপহার দেয়।এই কাজটা না করার অপরাধে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না।আমারও ইচ্ছে হয় কিছু একটা দেই।আব্বা আমাদের ভাইবোনকে হাত খরচ দিতেন না।বলতেন,বাড়ির ভাত খেয়ে স্কুলে যায়,হাতখরচ লাগবে কেন?সেবারই প্রথম আমি সুযোগ বুঝে আম্মা পুকুরে গোসল করতে গেলে ঘরের মাচা থেকে সুপারি চুরি করি।সুপারি চুরি করে বিক্রি করতে গিয়ে আব্বার কাছে ধরা পড়ে বেদম মার খাই।যার কাছে সুপারি বিক্রি করি সেই সাহেদ আলী চাচা আব্বার পরিচিত হওয়ায় সব তথ্য জানিয়ে দেয়।মার খেয়ে পিঠে দাগ হয়ে গেছে,ঠোঁট কেটে গেছে তবু সব সয়ে গেছি টাকাটা আব্বা ফিরিয়ে না নেওয়ায়।পঞ্চাশ টাকা একসাথে সেই প্রথম দেখেছি।আয়শাকে কতকিছু কিনে দেওয়ার কথা ভেবেই চলছি কিন্তু কী যে কিনবো বুঝতে পারছিলাম না।টাকাটা একটা কাগজে ভাঁজ করে সুতো দিয়ে পেঁচিয়ে পকেটে নিয়ে ঘুরি।
টাকাটা খরচ করতে পারি না,অপেক্ষায় থাকি হয়তো কোনদিন সুযোগ আসবে আয়শাকে সাথে নিয়ে কিছু কিনে দেয়ার।হাটের দিনে সাজি ভর্তি কাঁচের চুড়ি বিক্রি হয়।লাল-নীল চুড়ি গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে ভাবি আয়শা আর আমি এক সাথে রিক্সায় করে যাচ্ছি,চুড়ি বাজছে টুংটাং। আমি ওর চুলের গন্ধ পাচ্ছি,মাথার ঘোমটা সরে যাচ্ছে।
বর্ষাকাল।সেদিন ছিলো ভরা পূর্ণিমা। আমাদের ভাঙা বাড়ির জানালা থেকে আলো এসেছে ভেতরে।তখন বৃষ্টি থেমে গেছে।আম্মার লাগানো মেহেদি গাছে ফুল ফুটেছে। দোলনচাঁপা ফুল আর মেহেদি ফুল থেকে অদ্ভুত সুগন্ধ আসছে।আমি জানালার সিক ধরে দাঁড়িয়ে অকারণে কাঁদতে থাকি।আজ মাগরিব বাদে আয়শার বিয়ে হয়ে গেছে কুয়েতে চাকরিরত হোসেন মল্লিকের সাথে।
পরদিন আমি স্কুলে যাইনি।বিকেলে রতন এলো।আমরা ছাতা নিয়ে বজলুদের বাড়িতে গেলাম।বজলু চুপ করে বসে ছিলো ওর পড়ার ঘরে।আয়শাদের বাড়ি থেকে বিয়ের গান ভেসে আসছে মাইকে।বৃষ্টির দিনেও মাইক বাজছে।আমরা তিন বন্ধু মাথা নিচু করে বসে থাকি।বজলুদের অনেক টাকা।বালিশের নিচ থেকে খুচরো বের করে রতনকে বল, ‘ চল,খনকার বাড়ির কাচারিতে গিয়া বিড়ি খাই।’
বৃষ্টিতে পথ ছিলো পিচ্ছিল তা উপেক্ষা করে, আমরা তিন বন্ধু বাদশার দোকান থেকে বিড়ি কিনে ভাঙা নির্জন কাচারিতে গিয়ে দাঁড়াই।
বর্ষার দিনে গ্রাম এমনিতেই থাকে চুপচাপ, বিষন্ন।তাকে আরো গভীর করে দিয়ে আয়শা শ্বশুর বাড়ি চলে যায়।
২.
আয়শা আমাদের সাথেই প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে। তখন আমরা হাত ধরে কত খেলা খেলেছি।স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সালাম স্যার চাইতেন আয়শা সবকিছুতে ফাস্ট হোক।সারাদিন খেলার পরে বিকেলে বিচিত্রাঅনুষ্ঠান এবং প্রাইজ বিতরণ হতো।আয়শা সে অনুষ্ঠানে গান গাইতো,নাচতো।’বাবু সেলাম বারে বার’,এই নাচটি নাচার সময় আয়শা বেদেনী সাজতো।লাল ডোরাকাটা শাড়ি, লাল ফিতেয় চুল বাঁধা আয়শাকে মনে হতো হঠাৎ বেড়াতে আসা কেউ।একটু বড় হবার পর আমরা যখন হাই স্কুলে ভর্তি হলাম,তখন আয়শা আমাদের সাথে পড়লেও দূরে থাকতো।আয়শার দিকে তাকাতে আমাদেরও তখন লজ্জা লাগতো।ওড়না মাথায় দিয়ে অন্য মেয়েদের সাথে থাকতো সে।কেমন বড় আর সুন্দর হয়ে উঠলো আয়শা।ওর গোলগোল কাজলটানা চোখ,হলুদ মসৃণ হাত, সদ্য ওঠা বুক পাগল করে দিতো।
বজলুই একদিন সাদেকস্যারের ওপর রেগে যায় আয়শার সাথে ফুসুরফাসুর করায়।
বলে,’উনি আয়শাকে চোখ দিয়া খায়,হারামজাদা কোথাকার।একদিন অন্ধকারে ধাক্কা দিয়া খালে ফালাইয়া দিমু।’
আয়শার সাথে আমাদের কথা না হলেও আমরা কেন যেন জানতাম আয়শা আমাদেরই।এ ব্যাপারে বজলুই ছিলো বেশি সাহসী। ধর্ম আলাদা বলে রতন ছিলো বিরহী। মাঝে মাঝে এজন্য সে মুসলমান হতেও চাইতো।
বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলেও আমরা কেমন নিশ্চুপ হয়ে যাই।মাঠে খেলতেও যাই না।আয়শার প্রস্থান পুরো গ্রামটাকে অন্ধকার করে দেয়।বজলু এরমধ্যে বিড়ি খাওয়ায় ওস্তাদ হয়ে ওঠে।
৩.
আমরা তখন কলেজে পড়ি।আব্বা আমাকে শহরে মামার বাসায় রেখে শহরের কলেজে ভর্তি করে দেয়।পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরলে রতন বলে,সুমন তুই তো ছিলি না,এদিকে অনেক ঘটনা হয়ে গেছে।
আমি রতনকে রহস্য না করে খুলে বলতে বলি।রতন জানায় আয়শা ওর স্বামীকে ফেলে পালিয়ে গেছে।আমার মুখ থেকে বের হয়ে আসে,বজলুর সাথে?
রতন মাথা নাড়ে।বলে,টেনু ভুঁইয়ার সাথে।টেনু ভুঁইয়া আমাদের গ্রামের পয়সাওয়ালা লোক।বাবরি চুল,দিলখোশ মানুষ। তবে আগেও বিয়ে করেছে।বৌ মরে গেছে।
এরপর কদিন ধরে গ্রামে পুলিশ আসে।আয়শার স্বামী, টেনু ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে আয়শাকে অপহরণের মামলা করেছে।আমরা সবাই তামাশা দেখছি।গ্রামে এখন একটাই আলোচনার বিষয়,আয়শা ও টেনু ভুঁইয়ার কাজ কারবার।পুলিশের ভয়ে আয়শা ও টেনু ভুঁইয়া পালিয়ে থাকে।এক পক্ষ পুলিশ আনে অন্য পক্ষ ঘুয দিয়ে নিরাপদে সরে যায়।গ্রামে দুটো দল গড়ে উঠে। একদল আয়শার স্বামীর পক্ষে,অন্য দল টেনু ভুঁইয়ার দলে।তবে দু দলই আয়শার নিন্দা-মন্দ করে।বিশেষ তো আয়শা যে সুন্দর এটাই যেন ওর অপরাধ। মুরুব্বিরা যখন তখন প্রবাদ আওরায়,’অতি বড় রূপসী না পায় বর ‘। আজকাল মেয়েদের বারো ভাতার না হলে চলে না এইসব।আয়শার বাবা, মা দিশেহারা হয়ে বিদেশ ফেরত জামাইয়ের কথায় উঠ-বস করে।মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়।আমরা তিন বন্ধু যে যার মতো আয়শার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, আবার তাশ খেলা নিয়ে মেতে উঠি।
গরমের কারণে ইদানিং আমরা খালপারে বসে হাওয়া খাই।এখানে খালের কিনারে পাকা ঘাট আছে।চাঁদ ওঠার পর রতন বাঁশিতে ‘আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলে’ বাজায়।বজলু চুপ করে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে।চাঁদ চোখের ওপর খলবল করে আলো ছড়ায়।পানিতে সোনালি আভা কেঁপে ওঠে।খালের ঘাটে একটা নৌকা এসে লাগে।ছইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে আয়শা।সাথে টেনু ভুঁইয়া।ওরা সামনে পা বাড়ায়।চাঁদের আলোয় খালের পানিতে আয়শার ভেজা ফর্সা পা চকচক করে ওঠে।নীল হলুদ ছাপা শাড়ি বাতাসে দোল খায়।
বজলু কেমন রাগী গলায় ডাকে,’কথা শুইন্যা যাও আয়শা।’
আয়শা দাঁড়ায়।
বজলু বলে,’এইসব কি আয়শা,স্বামীরে রাইখা পলাইয়া পলাইয়া থাহ কেন?’
আয়শা ফোঁস করে বলে,’আমার খুশি। ‘
বজলু বেশ জোরের সাথে বলে,’আমাদের গেরামের মান ইজ্জত তো আর থাহে না।এই সব আর চলবো না।’
টেনু ভুঁইয়া পেছন ফিরে তেড়ে আসে।বলে,’তুই কে?তোরে কে ডাকছে খবরদারি করতে?’
বজলু বলে,’তুমি মিয়া সামনে যাও তোমারে কিছু কই নাই।আয়শা আমাগো সহপাঠী। ওর নিন্দা হুনলে খারাপ লাগে।’
আয়শা ব্যঙ্গ করে বলে,আমার নিন্দা আমি হুনুম তোমাগো কওনের কি?এমন বিয়া অইছে হউর বড়িতে খাইট্টা মরি,খোটা হুনি জামাই দেহি না। বিদেশে বৎসর পার কইরা এ্যাক মাসের জন্য দেশে আইসা মনে পড়ে তার বৌ আছে।অমন সোয়ামী চাই না।তার সাথে তালাক অইয়া গেছে।পুলিশ আর কিছু করতে পারবো না।’
আমি আয়শার দিকে তাকিয়ে থাকি।এত কথা বলতে কখন শিখলো মেয়েটি।
Leave a Reply