রেখা রায়।।
সেদিন গুরুপূর্ণিমা। সকাল থেকেই সারা ফেস বুক জুড়ে গুরু প্রণামের ঘনঘটা। ঋতুর এসব মনেই থাকে না। সংসার গুছোতে গুছোতেই জেরবার।সকাল সকাল ছেলেমেয়েকে খাইয়ে গুছিয়ে স্কুলের গাড়িতে তুলে দিয়ে বরকে অফিসে পাঠালো। তারপর সংসার গুছোতে শুরু করল ঋতু। তার আগে একটু বিশ্রাম, খাটে বসে।
নেট অন করে গুরুপ্রণামের বিষয়টি নজর কাড়ে। সে-ই বা পিছিয়ে থাকবে কেন! অতএব এমন দিনে গুরুপ্রণাম জানাতেই হবে ফেস বুকে। গুরু খুঁজতে বসল ঋতু। খুঁজেই চলেছে , যাকে প্রণাম জানিয়ে ফেস বুকে অন্তত একটা পোস্ট দেওয়া যায় আজকের দিনে। ঘোরের মধ্যে সংসারের যাবতীয় কাজ গুছোতে লাগল। মনের মধ্যে …গুরু…গুরু…।
হাক্লান্ত ঋতু এখন দুপুরের ভাতঘুমে ।
তখনই স্বপ্নের উড়ানটা এল। কিন্তু কিছুতেই উড়ানটাকে ছুঁতে পারছে না ঋতু। ওকে ফেলেই ডানা মেলল উড়ান মহাশূন্যে। প্রায় দিনই এমন একটা আধ খ্যাঁচড়া স্বপ্ন আসে। তারপর মন কেমন করা এক বিষন্নতা ঘিরে থাকে সারা বিকেল। ছেলেমেয়ে ফেরে। বরের ফিরতে অনেক রাত। মনকেমনিয়া নিয়েই বিকেল গড়িয়ে যায় সন্ধ্যার আঙিনায়।
ছেলেমেয়ে পড়তে বসে। ঋতু ওদের পাশে বসে থাকে। ওদের সাহায্য করে, খুনসুটি থামায়। তারপর ঐ গতানুগতিক রুটিন…বর ফেরে…সারাদিনের সাংসারিক গাথা তার কানে তোলা…তার মনোরঞ্জন ইত্যাদিতে ব্যস্ত হতে হতে পরের দিনের অপেক্ষা…। তার মধ্যেও আজকের বিষন্নতা আর কাটে না কিছুতেই।
সে এক ঝড়, পক্ষীরাজে সওয়ার হয়ে এল
পড়ন্ত বিকেলে । তখন পাতায় পাতায় চিকন রোদের গড়িমসি। পোড়া ঘায়ে জ্যেৎস্নার চন্দন যেন বা। বাগানের ফুলগুলো জ্যোৎস্না শুষে নিল রোমে রোমে। ক-টা দিন এমনি বাঁশি বাজতেই রইল চরাচরে। তারপর হঠাৎ গা ঢাকা দিল ধূসর পাহাড়ের ওপারে একদিন। যেতে যেতে কিছু স্বপ্নের বীজ উড়িয়ে বুনে দিল বুকের মধ্যে।
যেন দখিনাটি !! যেন দুরন্ত কালবৈশাখীর প্রথম বর্ষণ !!
তারপর দুর্যোগের ঘনঘটা সারাদিনমান। চোখের জল বাঁধনহারা। যখন তখন গাল বেয়ে বুকের কাপড় ভিজিয়ে গড়িয়ে চলল সময়ে অসময়ে। এলোমেলো জগৎ সংসার।
এমনি চলতে চলতে একদিন নিজেকে খুঁজে পায় ঋতু। অনুভব করে,
“যাহার লাগি বইয়ে দিলেম ঘড়া ঘড়া অশ্রুসাগর
তাহারে বাদ দিয়েও দেখি বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর।”
চারপাশে এত নক্ষত্র যে এক জন্মে গুণে শেষ করা যাবে না…।
ছন্দে ফেরে ঋতু। এবার গুরু খুঁজে পায়। তিনটি বেলপাতায় গুরু প্রণাম এঁকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে বাড়ির পাঁচিলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কোয়েনার দিকে। পূর্ণিমার জোয়ারে ভরভরন্ত নদী চকচক করছে জ্যেৎস্নায়। বড় থালার মত গোল চাঁদ দোল খাচ্ছে ছলাৎ ছলাৎ। কী এক মুগ্ধতায় বসল ভাঙা সিঁড়িতে। তারপর ধীরে ধীরে নেমে আসে জলের কিনারে। গুরুকে স্মরণ করে পাতা তিনটি ভাসিয়ে দেয় কোয়েনার কাকচক্ষু জলে, সেই ঝড়ের উদ্দেশ্যে। তারপর ত্বরিত পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে চলে জ্যোৎস্নায় জিছতে ভিজতে। রাত শেষ হয়ে আসছে। আজই তো ” প্রণাম”-টি নিবেদন করতে হবে ফেস বুকে।
Leave a Reply