শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
কাশিমপুর চৌধুরী জমিদার বাড়ি

কাশিমপুর চৌধুরী জমিদার বাড়ি

ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম

নওগাঁ জেলা সদর থেকে আনুমানিক ১৬ কি.মি দক্ষিণ দিকে এই চৌধুরী জমিদার বাড়ির অবস্থান। নওগাঁ-আত্রাই সড়কের কাশিমপুর নামক রাস্তার মোড়ে নেমে আনুমানিক ৫০০ গজ পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলে এই জমিদার বাড়িটি পাওয়া যায়। যে কোনো যানবাহনে চড়ে অনায়াসে এই স্থানটিতে গমনাগমন করা যায়। উপজেলা সদর আত্রাই থেকে সরাসরি উত্তরে যে সড়কটি জেলাশহর নওগাঁয় এসেছে, সে সড়ক দিয়েও সহজে কাশিমপুর রাস্তার মোড়ে নেমে গমন করা যায়। মুসলিম জাগিরদার কাশিম খাঁর নাম অনুসারে এই জমিদারির নামকরণ হয়েছিল কাশিমপুর চেীধুরী জমিদার বংশ। সম্রাট আকবরের বাংলা বিজয়ের সময় তাঁকে উৎখাত করে জনৈক গঙ্গানন্দ সান্যালকে জমিদারির দায়িত্ব দিয়ে চৌধুরী উপাধি প্রদান করা হয়। এই বংশের আদি পুরুষ ছিলেন গঙ্গানন্দ সান্যাল। তিনি ছিলেন ধরাধর বংশজাত। গঙ্গানন্দ সান্যালের সময় থেকে কাশিমপুর চৌধুরী জমিদার বংশের উন্নতি সাধিত হয়। তাঁর চারজন পুত্র সন্তান ছিল। প্রথম পুত্রের নাম শিবরাম, দ্বিতীয় পুত্রের নাম সীতারাম, তৃতীয় পুত্রের নাম রামনারায়ণ এবং চতুর্থ পুত্রের নাম দেবীদাস। এঁদের বংশধরগণই কাশিমপুরের চৌধুরী জমিদার বংশ। আরও জানা যায় যে, কাশিমপুরে বাস করতেন কাশিম খাঁ নামক একজন মোগল জায়গীরদার। তাঁর বংশ লোপ পেলে তিনি তাঁর সম্পত্তিসমূহ গঙ্গানন্দ সান্যালের বড়পুত্র শিবরামকে দান করেন। যার মূল্য ছিল প্রায় তিনলক্ষ টাকা। টাকা প্রদান করলে শিবরামকে তিনি চৌধুরী উপাধি দেন। এই চৌধুরী বাংলার চৌদ্দ চৌধুরীর এক চৌধুরী হিসেবে কথিত আছে। সম্পত্তি প্রাপ্তির পর শিবরাম কাশিমপুরে বাস করতে থাকেন। কাশিমপুর ব্যতীত শিবরামের আরও অনেক জমিদারি ছিল। শিবরামের ছিল দুজন স্ত্রী। বড় স্ত্রীর ছিল দুজন পুত্র সন্তান। তাঁরা হলেন করকৃষ্ণবল্লভ এবং বিষ্ণুবল্লভ। এঁরা কাশিমপুরে থাকতেন। কৃষ্ণবল্লভের পুত্রের নাম ব্রজবল্লভ। জানা যায় যে, রাজা রামজীবন একবার কাশিমপুরে এসেছিলেন। এখানে এসে তিনি ব্রজবল্লভের গৃহে আহার করেছিলেন। ব্রজবল্লভ তাঁকে লৌকিকতা স্বরূপ কালিগড় পরগনা দান করেন। রাজা রামজীবন কেবল কাশিমপুর পরগনা ব্রজবল্লভের জন্য রেখে দিয়ে অন্যান্য সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। দ্বিতীয় স্ত্রীর পুত্র শ্রীমোহন কাশিমপুর থেকে অন্যত্র চলে যান। বংশ পরম্পরায় জানা যায় যে, গঙ্গানন্দ সান্যালের বংশবিস্তার বহুবিস্তৃত। প্রায় ৭৪/৭৫ জন সদস্য ছিল গঙ্গানন্দ সান্যালের পরিবারটিতে। বহু অংশীদার ছিল এই চৌধুরী জমিদার বংশে। বহু সংখ্যক সদস্যের মধ্যে রুদ্রকান্ত চৌধুরীর বংশই ছিল প্রসিদ্ধ। রুদ্রকান্তের পুত্র হরকান্ত ছিলেন একজন সদাশয় ব্যক্তি। তিনি যথাযথভাবে তীর্থ পরিভ্রমণ করতেন ও মহাভারত পাঠকারীদের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। হরকান্তের পুত্র সারদাকান্ত ছিলেন একজন সুশিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষ। এই বংশের শেষ পুরুষ হিসেবে পাওয়া যায় বৈদ্যনাথ চৌধুরী ও গিরীন্দ্রনাথ চৌধুরীকে। এই চৌধুরী জমিদার পরিবারের কোনো সদস্য এখন আর এখানে নেই। বর্তমানে তাঁদের সমকালের নিদর্শনাবলি ও ঐতিহ্যগুলো বিলুপ্তির পথে। তবে এখনো পুরোপুরি বিলুপ্তি হয়নি কথাটি বলা যেতে পারে। কারণ এই চৌধুরী জমিদার বাড়ির একটি ভবনে বর্তমানে কাশিমপুর-মিরাট ইউনিয়ন ভূমি অফিস অবস্থিত। চৌধুরী জমিদার বাড়িটিতে প্রধানত দুটি ভবন রয়েছে। এর একটি উত্তরমুখী এবং অপরটি পূর্বমুখী। উত্তরমুখী ভবনটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভগ্ন ও পরিত্যক্ত। এর মধ্যে পূর্বদিকের কক্ষটি ৪৪’-৫”১৩’-৪” আয়তন বিশিষ্ট। মাঝেরটি ১০’-৪”১২’-৬” এবং পশ্চিমে দিকে দুটি ছোটো পরিসরের কক্ষ আছে। তবে এই চৌধুরী জমিদার বাড়ির প্রধান বা মূল ভবনটির সম্মুখভাগ পূর্বমুখী। এই পূর্বমুখী ভবনটিতেই এখন ভূমি অফিস অবস্থিত। চুন-সুরকির গাঁথুনি দিয়ে ভবন দুটি নির্মিত হয়। তবে ভবনের ছাদের নিম্নাংশে রয়েছে মোটা আকৃতির কাঠের বরগা বা তীর।

চৌধুরী জমিদার বাড়িটি থেকে আনুমানিক ১০০ গজ দূরত্বে বহু ‍পুরনো একটি কালী মন্দির আছে। স্থানীয় লোকজন এই মন্দিরটিকে চৌধুরী জমিদার আমলের মন্দির হিসেবে মনে করেন। তবে কৌতূহলের বিষয় হলো মন্দিরটিকে ঘিরে বিশাল আকৃতির একটি গাছ দণ্ডায়মান রয়েছে। গাছটি যে শত শত বছরের পুরনো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশাল আকৃতির গাছটিতে অনেকগুলো বৃক্ষের সম্মিলন ঘটেছে। গাছটিতে পাইকড় গাছের মতো গোলাকৃতির ফল ধরে। ফলটির নাম স্থানীয় কোনো মানুষ বলতে পারেন না। আর চেনাজানা বৃক্ষ হিসেবে কেবল একটি তেতুল গাছকে পাওয়া যায়। অবশিষ্ট গাছগুলোর নাম লেখক জানতে পারেন নি। তবে স্থানীয়লোক ও অন্যান্য মানুষকে সাধ্যমতো জিজ্ঞাসা করেও উদ্ধার করতে পারেন নি অবশিষ্ট গাছগুলোর নাম কী! গাছটির শেকড় অংশে মন্দিরটির অবস্থান। অর্থাৎ গাছটির শিকড় এমনভাবে আবৃত যে, যেন মনে হতে চাইবে গাছের শিকড় দিয়েই তৈরি হয়েছে মন্দিরটি। অনেক পূর্ব থেকে মন্দিরকে ঘিরে একটি বাৎসরিক মেলা এখনো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম
গবেষক, প্রাবন্ধিক, ইতিহাসজ্ঞ
এবং
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ,
নওগাঁ সরকারি কলেজ, নওগাঁ

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD