শাহীন রেজা।।
গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে উঠোনে। ছোট্ট অপ্রশস্ত উঠোন। এক কোণে খড়ের গাদা। তার পাশে গোয়াল-ঘর। দোচালা ঘরটার দাওয়ায় খুঁটিতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে রহিমুদ্দি। উদাস দৃষ্টি কোনদিকে ছড়ান তা নিজেও জানে না।
চারিদিকে সুনশান। পোকামাকড়ের ডাক আর ঝরাপাতার শব্দ ছাড়া কোন শব্দ নেই বাড়িটায়। ঘরটাও নিস্তব্ধ, নিঝুম। এতো রাত তবু কুপি জ্বলেনি। অন্ধকারে ভয়ানক রকম ভূতুড়ে লাগছে সব। রহিমুদ্দির অবশ্য কোনো বিকার নেই। একমনে জ্যোৎস্নাধোয়া প্রকৃতিতে মগ্ন সে। প্রকৃতি এত সুন্দর কেন? এই চাঁদ, এই গাছপালা, এই নির্জনতা কী ভীষণ প্রিয় ছিল পারুলের। পারুল। নামটা মনে হতেই নড়েচড়ে বসে রহিমুদ্দি। বুকের ভেতর বহুদিনের চেপে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা ফাটা বেলুনের মত ‘হুস’ করে বের হয়ে আসে। অতীতের দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রের মত ভেসে উঠতে থাকে মনের পর্দায়।
পারুল, ফুলতলি গ্রামের মেয়ে। দেড় হাত বেণী দুলিয়ে স্কুলে যেত। ভ্যানচালক তাগড়া জোয়ান রহিমুদ্দির সিনেমা দেখা চোখে রাতারাতি ‘রোজিনা’ হয়ে গেল সে। একদিন বাড়ি ফেরার পথে ভ্যান থামিয়ে ডাক দিয়ে ফেলল,
-পারুল, এই পারুল, বাড়ি যাইতাছস। আয়, ভ্যানে আয়। পোঁছাইয়া দিমুনে।
অতটুকু মেয়ে অথচ কতো দেমাগ। বেণী দুলিয়ে একেবারে মুখের উপর না করে দিল। জেদ চেপে যায় রহিমুদ্দির,
-আরে চল্ না। ট্যাকা লাগবো না, চল্।
-ক্যান্, ট্যাকা ছাড়া যামু ক্যান্! তুমি আমার ক্যাডা যে ট্যাকা ছাড়া লইয়া যাইবা?
– আমি ক্যাডা সেইটা পরে হবো নে। তুই চল, আগে পোঁছাইয়া দেই।
– না, আমি যামুনা। তুমি পথ ছাড়ো।
পারুলের জেদের কাছে সেদিন সত্যি সত্যি হার মেনেছিল রহিমুদ্দি। ভ্যানটা সরাতেই পাশ দিয়ে বেণী দুলাতে দুলাতে স্বপনের মতো চলে গিয়েছিল পারুল।
এর ক’দিন পরেই গ্রামে যাত্রা বসল। মানিকগঞ্জের ‘মালতি অপেরা’। খুব বড়ো দল। প্রায় দিনই রহিমুদ্দি যাত্রা দেখতে যেত। সেদিনের পালা ‘দেবদাস’। দেবদাসের নায়িকা পার্বতী। পার্বতী পুকুরঘাটে দেবদাসকে ফিরিয়ে দিলে ক্ষিপ্ত দেবদাস গর্জে উঠেছিল – চাঁদেও কলঙ্ক থাকে পারু। তারপর ছিপ দিয়ে আঘাত করেছিল পার্বতীর কপালে। ‘উহ্’ বলে কপাল ঢেকেছিল পার্বতী। তার দু’হাতের মাঝ দিয়ে নেমে আসা রক্তের ধারা দেখে শিউরে উঠেছিল রহিমুদ্দি। চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল মঞ্চ থেকে। ঠিক তখনই অনেক মেয়ের ভীড়ে পারুলের চাঁদমুখটা ধরা পড়েছিল তার চোখের আয়নায়। মঞ্চের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পারুল। তার চোখের কোন ভেজা ভেজা, চিক্চিক্ করছে অশ্রু। বড্ডো মায়া জেগে উঠেছিল রহিমুদ্দির মনে। মনে মনে বলেছিল – না পারু। আমারে ছাইড়া গেলেও আমি কুনোদিন তুমারে অমন কইরা আঘাত দিমু না।
যাত্রা শেষ হলে ঘরমুখো মানুষের ভীড়ে পারুলকে খুঁজে খুঁজে হয়রান রহিমুদ্দি। দেবদাসের পারু আছে। তারও পারুকে চাই। তাকে পেতেই হবে। উ™£ান্তের মতো খুঁজে খুঁজে অবশেষে বটগাছের নিচে তাদেরকে খুঁজে পেয়েছিল সে। তখনও রাতের আকাশ পুরোপুরি ফর্সা হয়ে ওঠেনি। আলো আঁধারীতে মায়াময় সে মুহূর্তে পারুলকে মনে হচ্ছিল এক অপ্সরী, যেন রাতের আকাশ থেকে এইমাত্র নেমে এসেছে মাটিতে। ঘাসপথ পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় উঠতেই তাদের মুখোমুখি হয়েছিল রহিমুদ্দি। পারুলের মা’কে উদ্দেশ্য করে বলেছিল-
-খালা, অহনো আন্ধার। পারুরে লইয়া একলা বাড়ি যাইতে আপনার কষ্ট হইবো। চলেন ভ্যানে কইরা আগাইয়া দেই।
বাতের রোগী পারুলের মা। একটানা বসে থাকতে থাকতে এমনিতেই কোমর ধরে গেছে। এর উপর তিন ক্রোশ পথ। সাথে জোয়ান মেয়ে। রহিমুদ্দির প্রস্তাবে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিল হনুফা বিবি। পান খাওয়া মুখটা প্রসন্ন করে বলেছিল,
-চলো বাবা। সেই ভালা। কিন্তু কতো ট্যাকা লাগবো তাতো বললা না। আমি বাবা দুই ট্যাকার বেশি দিবার পারমু না।
হনুফার কথায় হা-হা করে উঠেছিল রহিমুদ্দি-
-কি যে কন্ খালা। আপনে তো মায়ের মতন। আপনার কাছ থেইক্যা ট্যাকা নিমু ক্যাম্নে।
হনুফার পান খাওয়া মুখে হাসিটা দীর্ঘতর হলেও পার্বতীর মনে জেগে উঠেছিল সংশয়। গ্রামের মেয়ে হলেও অল্প বয়সেই জীবনের অনেকটা দেখা হয়ে গেছে তার। মনে মনে ভেবেছিল, লোকটার নিশ্চয়ই কোনো মতলব আছে, নইলে অকারণে বিনা পয়সায় তাদেরকে পৌঁছে দিতে চাইবে কেন! চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল সে। পা দিয়ে শক্ত মাটিতে আঁচড় বসাচ্ছিল আপন মনে।
-ও পারু। উঠ্ উঠ্। পুলাটা যহন এতো কইরা কইতাছে।
মা’র কথায় সম্বিত ফিরে পেয়েছিল পারুল। ইচ্ছের বিরুদ্ধেও উঠে বসেছিল তিন চাক্কার ভ্যানে।
পারুল এবং হনুফাকে নিয়ে ফুলতলির পথে চলতে শুরু করেছিল ভ্যান। শিশির ভেজা কাঁচা পথ। গাড়ির চাকা আটকে যাচ্ছিল বারবার। তারপরেও ক্লান্তি ছিল না রহিমুদ্দির।
আজ তার ভ্যানে সবচেয়ে দামী প্যাসেঞ্জার। ভোরের শীতল বাতাসে দরদর করে ঘামছিল সে। এবং এতো কিছুর পরেও কন্ঠ ছেড়ে গান ধরেছিল-
‘ও কি ও কাজল ভোমরা-’
পারুলদেরকে পৌঁছে দেয়ার ঠিক তিনদিনের মাথায় ভর সন্ধ্যায় পান-তামাক আর কয়টা চিনির মিষ্টি নিয়ে রহিমুদ্দি হাজির হয়েছিল ওদের বাড়িতে। পারুল তখন হাঁস-মুরগি খোপে তুলতে ব্যস্ত। হনুফা বিবি দাওয়ায় বসে তেল ভরছিলেন কুপিতে। হঠাৎ পুরুষ ছেলেকে দেখে চম্কে যান তিনি। মাথায় কাপড় তুলে দিতে উদ্যত হন। রহিমুদ্দি সে দৃশ্য দেখে ফেটে পড়েছিল উদ্দাম হাসিতে,
-আরে করো কি, করো কি খালা। পুলাপানের সামনে কি মা-খালারা মাথায় কাপড় দ্যায়।
হাতের জিনিসগুলো এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,
-লও। আমারতো মা নাই। তুমার কথা মনে হইলো, তাই বাজারথন এইগুলো নিয়া আসলাম। তুমি খাইও।
স্বামী মারা যাবার পর এই প্রথম কোন পুরুষ ছেলে তার বাড়িতে হাতে করে কিছু নিয়ে এসেছে। মনে মনে মনে ভীষণ খুশি হলেও হনুফা বিবি সামান্য আপত্তির সুরে বলেছিল,
-আহা বাজান, তুমি তো পুলার মতোন,যখন খুশি আইবা, কিন্তু এইগুলো নিয়া আসলা কেন?
একগাল হাসি হেসে একান্ত আপন জনের মতো উত্তর দিয়েছিল রহিমুদ্দি,
-ছোটকালে বাপ-মায়ে পুলারে আর বড়ো হইলে পুলারা বাবা-মায়েরে খাওয়ায়। এইটাই নিয়ম। না খালা, অখনো তুমি আমারে আপন ভাবতে পারলা না-
রহিমুদ্দির আবেগভরা কথায় ভিজে গিয়েছিল হনুফার কোমল মন। কথা শেষ হবার আগেই তাকে থামিয়ে বলেছিল সে,
-না। সেইটা ঠিক না। পুলায় তো মা’র জন্য আনবোই। কিন্তু কথা হইলো গিয়া অভাবের বাজারে এতগুলান ট্যাকা…
রহিমুদ্দির মনে তখন পূর্ণিমার ভরা জোয়ার। বিনয় দেখিয়ে সে বলেছিল,
-এ আর কয়টা ট্যাকা। অনেক তো কামাই করি খালা, কিন্তু খাইবার লোক নাই। একটাই প্যাট। বাড়িতে হাঁড়ি চুলা নাই। গঞ্জে হাটে যা পাই তা-ই খাই। ভালোই চলতাছে, বাউন্ডুলা লাইফ আর কি।
একটু থেমে আবার মুখ খুলেছিল রহিমুদ্দি-
-তয় একখান কথা। তুমাদের দেখার পর মনটা বড়ো আনচান। একখান ঘর , একখান মা, একখান সংসারের জন্য বহুত টান জাইগা উঠছে অন্তরের মধ্যে।
শেষের কথাগুলো কেমন যেন দরদভরা। মায়ের মন হনুফা বিবির। চোখটা ভিজে উঠেছিল তার। দরদভরা কন্ঠে বলেছিল,
-বাপধন, খালা বইলা যখন ডাকছো মনে করবা আমি তুমার খালা-ই। আর খালাও যা, মা-ও তা। এইটারে নিজের ঘর, নিজের বাড়ি মনে করবা। যখন মন চাইবো চইলা আসবা।
কথাগুলো বলেই মনে হয়েছিল হনুফার, আহা ছেলেটাতো দাঁড়িয়ে আছে। ওকে বসতেই বলা হয়নি এখনো। অমনি মেয়ের ওপর চড়াও হয়েছিল সে,
-ও পারু, পুলাটারে একটু বসতে দে। কখন থাইকা দাঁড়াইয়া আছে। কইরে পারু, পাটিটা বিছায়া দে।
ছেঁড়া পাটিটা দাওয়ায় বিছাতে বিছাতে একবার মা আর একবার রহিমুদ্দির দিকে নজর দিচ্ছিল পারু। সত্যিই লোকটা শিকড় গেড়ে বসল। মা’র ওপর গিয়ে পড়েছিল তার সমস্ত রাগ-অভিমান।
সেদিন থেকেই পারুলদের বাড়িতে অবাধ যাতায়াত শুরু হয়েছিল রহিমুুদ্দির। পান-তামাক তো আছেই, কলাটা, মুলাটা, মাছ-মুরগি, আম-কাঁঠাল যখন যা হাতের কাছে পেতো তাই নিয়ে হাজির হতো, যেন নিজের বাড়ি। হনুফা রান্না-বান্না করে দিলে খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম করে তবে বাড়ি যেতো। বাড়িতো নয় ছাপড়া। ধানী জমির সাথে ছোট্ট একটা ছাপড়া তুলেছিল সে নিজে থাকবার জন্য। আপন মনে আসতো, আপন মনে যেতো। তার তো খোঁজ নেবার কেউ নেই। অথচ এই রহিমুদ্দিদেরই একদিন বিরাট বাড়ি ছিল। বিঘায় বিঘায় ধানী জমি। বত্রিশ হাত বন্দের ঘর। তার মাতবর বাবার দাপটে কাঁপতো আরো দু’দশটা গ্রাম। কিন্তু প্রকৃতি যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন রাতের মধ্যে অট্টালিকাও পরিণত হয় কুঁড়েঘরে, রাজাও হয়ে যায় পথের ফকির। একদিন এক সর্বনাশা ভাঙনে ওদের বাড়ি ঘর হারিয়ে গেল মেঘনায়। সর্বগ্রাসী মেঘনা একই সাথে কেড়ে নিল একুশ বিঘা ধানী জমি। রহিমুদ্দির বাবা নতুন ঘর তুললেন ঠিকই, কিন্তু সে ঘরে বসত শুরুর আগেই বৃদ্ধ মাতব্বর কলেরায় পাড়ি জমালেন ঊর্ধ্বলোকে। সেই শোকে মা-ও। বাবা-মা’র কবরটাও একদিন কেড়ে নিল মেঘনা। স্বজনহীন অনাথ রহিমুদ্দির দ্বিতীয় ঘরটাও বিলীন হলো মেঘনার বুকে। এরপর দূরে ধানী জমির পাশে তুলেছিল সে ছাপড়াটা। শেষ সম্বল পাঁচ বিঘা জমি দিয়ে দিয়েছিল বর্গা আর নিজে একটা ভ্যান কিনে নেমে পড়েছিল রাস্তায়। মাতব্বরের পুলা নয়ক্লাস পাশ দিয়া শেষ পর্যন্ত হইল কি না ভ্যান চালক। এ সবই ভাগ্য। আর সে ভাগ্যকেই মেনে নিয়েছে রহিমুদ্দি। এ জন্য ওর মনে কোন কষ্ট নেই, ক্ষোভ নেই।
পারুলদের বাড়িতে রহিমুদ্দির ঘন ঘন যাতায়াত অল্পদিনের মধ্যেই নজরে এসেছিল গ্রামবাসীর। প্রথম প্রথম তারা আমল না দিলেও সুফিয়া কুটনীর কথায় নড়েচড়ে বসেছিল সবাই। সত্যিই তো জোয়ান মর্দ বেটা, রক্তের আত্মীয় না, অন্য কোন সম্পর্কও না, ঘন ঘন ওই বাড়িতে যাবে কেন, কি কাজ তার ওখানে। তাও কি খালি হাতে, যখন তখন এটা সেটা নিয়ে। বিবাহযোগ্যা পারুলকেও বিশেষভাবে আলোচনায় টেনে এনেছিল সুফিয়া। এক কান দু’কান হতে হতে সরস গল্পটা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামময়। নাহ্ এ নাফরমানি কাজ গ্রামের মধ্যে চলতে দেয়া যায় না। ক্ষেপে উঠেছিল মাতবর, ক্ষেপে উঠেছিল আম-জনতা। তারা বারণ করেছিল হনুফাকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। উল্টো মুখিয়ে উঠেছিল সে,
-আমার পুলা আমার বাড়িতে আসবো, তাতে কার কি? ঠেকায় ক্যাঠা!
উত্তর এসেছিল-পুলাটা পাইছো কোথায়? ওটা কি তোমার রক্তের পুলা?
দমে গিয়েছিল হনুফা, মিন মিন করে বলেছিল,
-রক্তের না হইলেও পুলা। পুলা তো পুলাই, আবার কি?
-না না এমন কাম হইতে দিমু না।
দাড়িতে হাত বুলিয়ে ঘোষণা দিয়েছিল মাতবর।
এমন সময় এগিয়ে এসেছিলেন দবির সেখ। মুসল্লি মানুষ। পরহেজগার বলে এলাকায় বেশ নামডাক। শোনা যায়, রহিমুদ্দির বাপ এক সময় তার বন্ধু ছিল। অবশ্য সে কথা দবির সেখও স্বীকার করেন। সবার উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন,
-মিয়ারা, রক্তের সম্পর্কে না হইলেও পুলা হইতে পারে। পুলা হওন যায়। এই ধরো হনুফা বিবি যদি তার মাইয়াটারে রহিমুদ্দির কাছে বিবাহ দ্যায়, তা হইলে সে কি হনুফার পুলা হইলো না।
চারদিকে গুঞ্জন উঠেছিল, তাই তো। মুখ চাওয়া চাওয়ি করেছিল লোকজন। মাতবর অবশ্য বাধা দিয়েছিল,
-কিন্তু সেইটাতো এখনও হয় নাই।
দবির শেখের উত্তর,
-হয় নাই ঠিক কিন্তু হইতে কতোক্ষণ!
মুখ ঘুরিয়ে বিব্রত হনুফাকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন,
-কি গো হনুফা বিবি, তুমি কি কও?
-ভাইজান যা ভালো বোঝেন।
এরপর প্রশ্ন ছিলো রহিমুদ্দির কাছে
-কি মিয়া তুমি কি রাজি?
-আপনে যা ভালো বুঝবেন।
সামান্য মাথা কাত করে উত্তর দিয়েছিল রহিমুদ্দি।
তার উত্তরে ক্ষেপে গিয়েছিলেন সেখের বেটা। রাগত কন্ঠে বলেছিলেন,
-আমার কথা রাখো মিয়া। আমরা কি বলি সেইটা বড়ো কথা না। বিয়া করবা তুমি, তোমার মতামতটাই জরুরি। বলো তুমি রাজি কি না?
রহিমুদ্দির মনে তখন পূর্ণিমার ভরা জোয়ার। আনন্দে তা ধেই-ধেই নাচার অদম্য ইচ্ছেটা মনে গোপন করে সে উত্তর দিয়েছিল,
-আপনেরা যখন বলতাছেন তখন আমি আর অমত করুম ক্যান্। আমি রাজি।
-আলহামদুলিল্লাহ।
খুশি দবির সেখ গ্রামবাসীর দিকে নজর রেখে বলেছিলেন,
-কি মিয়ারা কামটা কেমুন হইলো, ভালা, না খারাপ?
-খুব ভালা। সেখের পো যেইটা করছেন, ভালা কাজ করছেন। আমরা সকলে খুশি।
এর ঠিক তিনদিন পর বাউন্ডুলে রহিমুদ্দির সাথে বিয়ে হয়েছিল পারুলের। বাসর রাতে লজ্জাবতী স্ত্রীর পা থেকে নুপুর খুলতে খুলতে প্রশ্ন করেছিল রহিমুদ্দি,
-কি গো কইন্যা পারুমতি, আমারে জামাই পাইয়া খুশি তো?
লজ্জায় লাল পারুল তখন নির্বাক। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুধু বলেছিল,
-যাও আমি জানি না।
বিয়ের পর পারুলদের বাড়িতেই উঠে এসেছিল রহিমুদ্দি। পুরুষহীন সংসারে একজন জোয়ান মর্দ ছেলের আবির্ভাবকে হনুফা বিবি হৃদয় দিয়ে স্বাগত জানালেও গ্রামের লোকদের চোখে বিষয়টি ভালো লাগেনি। ক্রমশ বাড়ছিল কানাঘুষা। একদিন রহিমুদ্দির কানেও ঢুকলো শব্দটি। ঘরজামাই। প্রথমে প্রচন্ড ক্ষোভে-দুঃখে মুষড়ে পড়েছিল সে। তারপর ফিরে দাঁড়িয়েছিল । মাতবরের রক্ত গর্জে উঠেছিল তার শিরায় শিরায়। ধানী জমি থেকে দু’বিঘা জমি বিক্রি করে সাতদিনের মাথায় তালুকদারের এই পোড়ো বাড়িটা কিনে নিয়েছিল রহিমুদ্দি। অক্লান্ত পরিশ্রমে দেড়মাসের মাথায় তুলেছিল দো’চালা ঘরটা। তারপর এক সন্ধ্যায় পারুলকে নিয়ে উঠে এসেছিল এখানে। এই ঘরে প্রথম সন্ধ্যা-প্রদীপটা জ্বালিয়েছিল পারুল, তার প্রাণের পারু।
ইস্, কি সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো। সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরতো রহিমুদ্দি। কোন কোন দিন রাত হয়ে যেত। নীরব নির্জন বাড়ি । মনটা পারুলের জন্য খুব আনচান করতো। কিন্তু সংসারে তৃতীয় জনের আগমন ঘটতে যাচ্ছে। রোজগারটা কম হলে তো চলে না। রহিমুদ্দিকে তাই খাটতে হতো প্রচুর। এদিকে বাড়িতে পারুলেরও অবসর নেই। গাছপালা লাগান, হাঁস-মুরগি বৃদ্ধি করা আরও কত কি। এতকিছুর মধ্যেও স্বামীর প্রিয় ডিমের কোরমা রাঁধতে সে ভুলত না । নিজ হাতে স্বামীকে বসিয়ে খাওয়াত পারুল। একটু কম খেলেই অভিযোগ তুলত আর বার বার প্রশ্ন করত
-কি গো মাতবরের বেটা, তরকারীটা ভালা হইছে তো?
মাথা নাড়ত রহিমুদ্দি আর তাতেই যেন মোম গলত। আশ্চর্য সারল্যে হেসে উঠত পারুল। তার পারু। ভালোই কাটছিল দিন। তৃতীয় জনের আবির্ভাব ক্ষণটা চলে এসেছিল একেবারে কাছে। গঞ্জের ডাক্তার বলেছিল, সপ্তাহখানেক। সেদিন ছিল শনিবার। সকাল থেকেই বৃষ্টি। বাঁশতলিতে প্যাসেঞ্জার নিয়ে গিয়েছিল রহিমুদ্দি। বেশ দূরের পথ। ফিরতি পথে গর্তের মধ্যে চাকা পড়ে ভেঙে গেল ‘ফর’টা। টেনে টেনে গাড়িটা গ্যারেজে নিতে সন্ধ্যারাত। যখন বাড়িতে এলো তখন দুটো প্রহর চলে গেছে রাতের পেটে। বাড়ির আঙিনায় এসেই বুকটা ধক্ করে উঠেছিল তার। ঘরে বাতি নেই। কোন সাড়াশব্দ নেই। এমনতো হবার কথা নয়। রহিমুদ্দি বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত পারুলতো কখনো ঘুমিয়ে পড়ে না, যতই অসুস্থ থাক বাতি জ্বেলে স্বামীর জন্য প্রতীক্ষা করে। সেদিন তার ব্যতিক্রম দেখে রহিমুদ্দির মনটা অজানা আশংকায় কেঁপে উঠেছিল বারবার। দাওয়ায় পা দিতেই একটা ভুতুম পেঁচা ডেকে উঠেছিল কোথাও। তাও একবার নয় পর পর তিনবার। শিথিল দেহে কোমর থেকে ম্যাচ নিয়ে আলো জ্বেলেছিল রহিমুদ্দি। চাপা দেয়া দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলতেই পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যটা ধরা দিয়েছিল ওর চোখে। ওর প্রিয় পারু, পারুল শুয়ে আছে তক্তপোষে, চারদিকে চাপ চাপ রক্ত, পাশে বসে আছেন নির্বাক হনুফা বিবি, তার কোলে নবজাতক, নিস্পন্দ-নির্জীব। পরদিন নিজ হাতে দু’টো লাশ দাফন করেছিল রহিমুদ্দি।
পারু চলে যাবার পর থেকেই বাড়িটা শূন্য খাঁ খাঁ। কেউ আসে না। পারুর মা হনুফা বিবিও না। রাতভর অন্ধকারে এ ঘরে ইঁদুরের উৎসব চলে। রহিমুদ্দি কোনদিনই কুপি জ¦ালে না। সময় অসময় নেই বসে থাকে দাওয়ায়। গ্রামে আর ‘যাত্রা’ আসে না। রহিমুদ্দির চোখে এখন ‘মালতী-অপেরা’। ‘দেবদাস’। হাসতে হাসতে মঞ্চে উঠবে তার পারু। দেবদাসের কঞ্চি দিয়ে রহিমুদ্দি আঘাত করবে তার কপালে। দরদর করে নেমে আসবে রক্তের ধারা।
‘আহ্ পারু, তুমারে আমি কুনোদিনই আঘাত করুম না, কুনোদিনই’-
বিড়বিড় করে শব্দ ক’টি বের হয় রহিমুদ্দির কণ্ঠ দিয়ে। আর তখনই একটা দমকা বাতাস কাঁপিয়ে দিয়ে যায় বাড়িটা। নির্জনতা ভেঙে ঝর ঝর করে ঝরে পড়ে কয়েকটি পাতা। জ্যো¯œার জলে ভিজতে থাকে বাড়িটা, ভিজতে থাকে রহিমুদ্দির স্মৃতির পারুল।
Leave a Reply