শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে

স্বাধীনতা

– দীপক সাহা (পশ্চিমবঙ্গ)

ঘুম থেকেই উঠে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে চা-বিস্কুট খেয়ে জিন্স প্যাণ্ট আর সবুজ রঙের পাঞ্জাবিটা গলিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল অরণ্য। স্কুলের পথে। গত দু’দিনের মতো আজও সকাল থেকে আকাশ মুখগোমড়া করে আছে। প্যানপেনে ঝিরকুটে বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে বাবার ফেলে যাওয়া দামাটওয়ালা ছাতাটা খুলে মাথায় দিল অরণ্য। এরকম ছাতার এখন আর তেমন ব্যবহার দেখা যায় না ,যদিও বৃষ্টির দিনে ভালোবেসে বাবার ছত্রচ্ছায়ায় মাঝে মাঝে নিজেকে রক্ষা করে সে। সিমেন্ট বাঁধানো গলি ধরে মিনিট চারেক হাঁটলেই পিচের রাস্তা। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছ’টার কাছাকাছি। এই সকালে রাস্তা প্রায় ফাঁকা। একটু অপেক্ষা করার পর একটা টোটো জুটল। হাত তুলতেই টোটোওয়ালা মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল – কোথায় যাবেন ?

– রানীনগর স্কুল ।

টোটোতে পিছনের সিটে বসে অরণ্য ভিজে ছাতাটা গুটিয়ে দুপায়ের মাঝে রেখে ছাতার কাঠের হাতল ধরে বেশ নিশ্চিতে বসল। টোটোটা সবুজ-সাদা -গেরুয়া বেলুন দিয়ে সাজানো। টোটো চলছে ,গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও পড়ছে। একটা অদ্ভুত ভালোলাগা অনুভূত হচ্ছে অরণ্যের। কিছুটা যেতেই ব্রিজের মুখে প্রতিবন্ধী ও অনাথ আশ্রমের কচিকাঁচাদের প্রভাতফেরি। টোটোর গতি ধীর হল।ফিরে চলেছে ওরা। রাস্তার ভীড়,যানবাহন এড়াতে প্রতিবছর এদিনে কাকভোরে পরিক্রমণে বেড়িয়ে পড়ে এরা। আজকের দিনে প্রতিকূলতা জয়ের উড়ান ভরে মনের স্পর্শে । জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী সাজা ছেলেটিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে খুদে নেতাজি। মিষ্টি পুচকি ভারতমাতা হাসিমুখে তার কোটো থেকে চকলেট বিলি করতে করতে পা টেনে টেনে চলেছে। টোটো থামিয়ে ওদেরও দুটি করে চকলেট দিল। অরণ্য পরম যত্নে চকলেট দুটো বুকপকেটে রাখল। বাড়ি ফিরে মেয়ে বৃষ্টিকে দেবে। এ শ্রাবণে মেয়ের দু’বছর বয়েস হল। হঠাৎ করে ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল। স্কুল শিক্ষক বাবাও তার জন্য লজেন্সচুস নিয়ে আসত। স্কুলে পড়ার সময় ওরাও পেত কাগজে মোড়ানো কমলা-সবুজ লজেন্স। একবার স্কুলে বোঁদে মুড়ি দেওয়া হয়েছিল। কাগজের ঠোঙা হাতে সে কি ঠেলাঠেলি। সে কথা মনে পড়তে আপন মনে হেসে উঠল অরণ্য।

লোকালয় ছাড়িয়ে গ্রামের নির্জন পথ দিয়ে টোটো ছুটছে। দুপাশে পাটের খেত। গোড়ালি জলে দল বেঁধে খেতমজুররা আজ কাস্তে হাতে পাট কাটায় ব্যস্ত। সার সার পাটের আঁটি মাটিতে বিছানো। জাগের অপেক্ষায়। এবার পাটের ফলন তেমন নয়। বর্ষায় তেমন বৃষ্টি হয়নি। স্কুলে যাওয়ার পথে রোজই দেখেছে কাঠি কাঠি গাছগুলো প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে পুড়ছে আর আকাশের দিকে চেয়ে চাষি হা হুতাশ করছে। হঠাৎ গত দু’দিন আগে নিম্ন চাপের বৃষ্টি নামল ,কিছুটা হাসি ফুটিয়ে। আঁশ কিছুটা পাবে , ন্যায্য দাম পাবে কিনা সন্দেহ আছে!

এদিকটা ছবির মত। দূর গ্রাম থেকে সরু লাল মোড়ামের পথ পাকা রাস্তায় মিশেছে। একা বৃদ্ধা হাঁটু মুড়ে মাথা নীচু করে ডান হাতে লাঠিতে ভর করে বসে আছে তেমাথা মোরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। টোটো দেখেই বৃদ্ধা লাঠিসমেত হাত তুলল ,

– বাবা , মনসাতলা যাব।

সঙ্গে একটা বস্তা। তার মধ্যে গোটা কয়েক গোলাকার কিছু হেল দোল করছে। ভারী বস্তা সহ বৃদ্ধাকে টোটোতে উঠতে দেখে অরণ্য সাহায্যের হাত বাড়াতেই বৃদ্ধা চড়া গলায় বলে উঠল ..

– আজ স্বাধীনতা দিবস ,আমি নিজেই পারব।

অরণ্য হকচকিয়ে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল। খুব কষ্টে তিনি বস্তা টোটোতে তুললেন। বৃদ্ধার দৃঢ়তায় অবাক হল সে। আগ্রহ বেড়ে গেল, ধমকের চোটে। বৃদ্ধা টোটোতে উঠে বসার পরে গভীর শ্বাস নিলে ,অরণ্য আলাপ জমানোর চেষ্টা করল। রাস্তার সাথে সাথে কথার পিঠে কথা চলল।

– আমার স্বামী স্বাধীনতা সংগ্রামী , দেশের জন্য জেলও খেটেছেন। নোয়াখালির দাঙ্গা হলেও দেশে ছিলাম বাবা। দেশভাগ হলে আমরা দু’জন ওপার বাংলার মেহেরপুর থেকে ঘটিবাটি, জমিজমা সব ছেড়ে এক কাপড়ে খালি হাত-পায়ে রাতের অন্ধকারে এপারে পালিয়ে এলাম। আমার বয়স তখন বারো। জেলছাড়া অনেক চোর, ডাকাত, বদমাশরা স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশনের খাতায় নাম তুলে ফেলল। বাদ পড়ল আমার স্বামী। স্বাধীনতা দিবসের দিনই শুধু তার ডাক পড়ত পতাকা তুলতে। উদাস দৃষ্টি চোখে নিয়ে ফ্যালফেলিয়ে চেয়ে বলল ..চল্লিশ বছর হল আমার স্বামী ক্যানসারে মারা গেছে। স্বামীর চিকিৎসা করাতে সব শেষ হয়ে গেছে বাবা।

এক নিশ্বাসে বৃদ্ধা বলে চললো।

– আপনার ছেলেমেয়ে ?
বড়ো ছেলেটা বড্ডো তাড়াতাড়ি চলে গেছে বাবা। কলেজে পড়ার সময় কোথায় যে উধাও হয়ে গেল! একদিন পুলিশ এল। কয়েকটা বইয়ের সাথে হালের গরু দুটোও সিজ করে নিয়ে গেল। অনেক কাল অপেক্ষা করে শ্রাদ্ধ শান্তি করে ফেলেছি , দায় রাখিনি । বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এতদিনে ফিরত ! কাপড়ের খুটে চোখ মুছতে মুছতে বুড়ি আপন মনে বলে চলেছে ..

– ছোটোটা কুলাঙ্গার। মদ গাঁজা খায়। কোন কাজ করে না। শুধু লটারি কাটে আর এ পাটি ওপাটির হয়ে ব্রিগেডে ভীড় বাড়াতে লোক ধরে বেড়ায়। বউমা পরের বাড়ি কাজ করে। বহু কষ্টে কোন রকমে চলে দিন চলে যায়।

বলতে বলতে মনসাতলা।
বৃদ্ধা অরণ্যকে বলল – বাবা, তোমার কাছে দশ টাকা হবে ?

– বুড়ি তবে আসল কথায় এসেছে ! অরণ্য মনে মনে বলল।

কিন্তু মুখে কিছু না বলে অরণ্য মানিব্যাগ খুলে কুড়ি টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিল। বৃদ্ধা প্রবল আপত্তি করে বলল ..

– না বাবা দশ টাকা হলেই হবে। একটা পতাকা কিনবো। নাতির জন্য। সকাল থেকে স্বাধীন খুব বায়না ধরেছে,পতাকা ওর চাই -ই চাই ।

অরণ্যর কাছে দশ টাকার নোট ছিল না। টোটোওয়ালার কাছে টাকা ভাঙিয়ে দশ টাকার অশোকচক্র মার্কা কয়েন তুলে দিল বৃদ্ধার হাতে। বৃদ্ধা বস্তা খুলে একটা পাকা তাল বের করে অরণ্যর হাতে দিয়ে বলল,
– এটা নাও । শুধু শুধু আমি তো তোমার কাছ থেকে টাকা নিতে পারব না , ভিক্ষে আমি করি না বাবা। শ্রাবণের প্রায় শেষ ,গায়ের রাস্তার ধারের গাছগুলোতে তাল পেকেছে , আঁধার থাকতে উঠলে অনেক কুড়ানো যায়। তাই নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছি।
অরণ্য তাল হাতে কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থাকল। বুকটা ভারী হয়ে উঠল। জীবনে এই প্রথম স্কুল শিক্ষক পিতার স্কুল শিক্ষক পুত্র অরণ্য আশি উর্ত্তীর্ণা বৃদ্ধার আত্মাভিমান ও দৃঢ়তার কাছে হার মেনে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ বুঝল। টোটো চলতে শুরু করেছে।সামনে স্কুলের গেট। স্কুলের ভেতর থেকে মাইকে ভেসে আসছে গান – বন্দে….. মা…তরম্….. ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD