রেখা রায়
একদা এক ডোবার ধারে বটের ঝুরিতে মেয়েটি দোল খাচ্ছিল বেশ। তখনো উত্তুরে বাতাস তেমন প্রখর হয়নি। চারিদিকে কাশের মেলা। ডোবায় শালুক ফুটেছে অগাধ। নীল আকাশে শিমূলতুলোর পারা মেঘ ভাসছে থোকায় থোকায়। প্রকৃতি সেজে উঠেছে। হাসিমুখে বট সহ্য করছে মেয়েটির দস্যিপনা। সখ্যে সাধ্যে নামিয়ে দিয়েছে রঙবেরঙের ঝুরি।
বছর ঘুরতে থাকে। ঋতুর পর ঋতু আসে যায় বছর বছর। বন্ধুতা বেড়ে চলে। সব হারানোর আনন্দে গর্বিত মেয়ে উজাড় করে মেলে ধরে একের পর এক তুলে রাখা তোরঙ্গ তার। যা সে কখনো কাউকে দেখাতে পারেনি, নির্দ্বিধায় দেখিয়ে চলে এখন। নিঃস্ব হওয়ার খেলায় অদ্ভুত মাদকতা পায়। রঙিন হয়ে ওঠে দিনকে দিন। কাটল ক-টি বছর।
তারপর সেবার এলো হেমন্ত। কুয়াশা ঘেরা দিন। ঝরিয়ে দেবার কাঁপন জাগে বটের পাতায় পাতায়। নতুনের আবাহনী বৃক্ষের শরীর জুড়ে।
সেদিনও দোল খেতে এসে মেয়েটি বোঝে ঝুরিগুলি তেমন সহযোগিতা করছে না। পিছলে পড়ল সে ডোবার জলে। বার বার বিপন্ন হাত দুটি তোলে। বাড়িয়ে দেয় বৃক্ষের দিকে। সাহায্যের কোনো হাত এগিয়ে আসে না সেদিন আর। হাবুডুবু খেতে খেতে সে ভাবতে থাকে…কী দরকার ছিল অমন রঙিন হয়ে ওঠার! বেশ তো ছিল রঙহীন বিবর্ণ দিনগুলো!
নির্দয় বট তখনো হাসতে থাকে…হাসতেই থাকে বোকা মেয়েটার দুর্দশা দেখে।
হঠাৎ মেয়েটির আত্মদর্শন হয়। বুঝে যায় বটবৃক্ষ বলে এতদিন ভেবেছিল যাকে, আসলে সে একটি আঁশ-শ্যাওড়া ছাড়া আর কিছু নয়।
ডোবার জলকে বড় আপন মনে হয় তার। প্রাণপনে আঁকড়ে ধরে। ঘূর্নি জাগে জলে। উথালপাথাল ঢেউ ওঠে অকস্মাৎ। ধরিত্রীমাতা যেমন সীতাদেবীকে তাঁর কোলে আশ্রয় দিয়েছিলেন ত্রেতা যুগে, তেমনি মায়ের মত পরম মমতায় মেয়েটিকে কোলে টেনে নিলেন বরুণদেব। বৃক্ষ তখনো দাঁড়িয়ে নির্মম দর্শক। কেশর ঝরিয়ে পাড়ের নিঃস্ব কাশগুলি সাক্ষী রইল ঝরে যাওয়া একটি ফুলের।
Leave a Reply