মইনুল হাসান
সমস্ত বরিশাল শহর কাঁপিয়ে স্টিমারের শেষ সিটি বেজে উঠলো। এক্ষুনি ছেড়ে যাবে, ঢাকা পৌঁছাতে সন্ধ্যা হবে। প্রশস্ত সিঁড়ি উঠিয়ে শুধুমাত্র একটি সরু সিঁড়ি রাখা ছিল কুলিদের নেমে যাবার এবং একদম শেষ মুহূর্তে আসা যাত্রীদের উঠবার জন্য। আমি বরাবরই এই শেষ দলের শেষ যাত্রী।
– শুনুন। সিঁড়িতে পা রাখা মাত্রই পিছন থেকে নারী কণ্ঠের ডাক। না আমি এবার শেষ যাত্রী নই, আমার পরেও একজন আছেন। পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখলাম পা থেকে সেন্ডেল খুলে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, খানিকটা সাহায্যের প্রত্যাশায়। এমন সরু সিঁড়িতে পা রাখতে ভয় পাচ্ছেন।
– আমার হাত ধরুন, নিচের দিকে তাকাবেন না। আমি সাহস দিলাম। আমার হাতে হাত রেখে বিশাল জলযানে উঠে এলো সে।
শিউলির সাথে এভাবেই আমার পরিচয়। খুব সুন্দর করে কথা বলে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। নীল তাঁতের শাড়ি পরনে। হালকা চশমার আড়ালে তাঁর স্বচ্ছ চাহনি। অদ্ভুত সুন্দর করে হাসে, গালে টোল পরে। শান্ত অবয়বে এক ধরনের কোমল স্নিগ্ধতা, লাবণ্যের বাঁধ ভাঙ্গা অপার্থিব উচ্ছাস। আমার ফুফু আমাদেরকে পরীর গল্প শোনাতেন। আমি ভাবতাম পরীরা দেখতে শিউলিদের মতন হয়। শুধু তাদের উড়তে হয় বলেই দু’টো ডানা থাকে বাড়তি।
নদীর দুপাশে ছবির মতো গ্রামগুলো পাশে রেখে আমাদের স্টিমার পানি কেটে তর তর করে এগিয়ে যায়। সেদিন শরতের আকাশে পেঁজা তুলোর মতো পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ছিল, নদীতে পাল তোলা নৌকা ছিল। আমাদের মন ভালো ছিল। তারপরও আমি কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি।
দু’জনেই আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আলাদা অনুষদ। সুযোগ পেলেই দেখা করি। ও খুব সুন্দর গল্প লেখে, আমি পারিনা। আমাকে পড়ে শোনায়, আমি তন্ময় হয়ে শুনি। আমার মুগ্ধতা কাটেনা। আমরা সুখের গল্প করি, দুঃখ ভাগ করি। আনন্দের আকাশটি আমাদের হয়। আমরা মুক্ত বিহঙ্গ হই, উড়ে উড়ে বেড়াই। একটু সুযোগ পেলেই আকাশ ছুঁতে চাই। আমাদের অনেকদিন, অনেকটা সময় একসাথে কাটে।
মৌমিতা, শিউলির বান্ধবী। এক শীতের ছুটিতে দুদিনের জন্য আমরা দুজনেই মৌমিতাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেদিন ছিল পূর্ণিমার রাত। জ্যোৎস্নার অপার্থিব আলোতে ভেসে যাচ্ছিল গ্রামের পথ-ঘাট, গাছপালা সব। বাতাসে ফুলের সৌরভ। মৌমিতাদের শান-বাঁধানো পুকুর ঘাটে আমি আর শিউলি নিরালায় অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসেছিলাম।
শিউলির আদুরে গাল ছুঁয়ে জ্যোৎস্নারা গলে গলে পড়ছিলো। সে কথা বলতেই শিউলি উচ্ছল হয়। হাসিতে জ্যোৎস্না রাতের আভাকে অদ্ভুত উচ্ছলতায়, আবেশে ভরিয়ে দেয়। আমি ওর নিষ্পাপ মুখের দিকে তন্ময় হয়ে তাঁকিয়ে থাকি। হাসিতে রাশি রাশি মুক্তো ঝরে, আমি তা কুড়িয়ে নেই।
মুক্তোর কথা শুনে শিউলি খিল-খিল করে হেসে ওঠে। সে হাসিতে আনন্দের ঢেউ আমাকে ছুঁয়ে যায়। আমি ওর উদ্বেলিত হৃদয় উৎসারিত ভালোবাসার ফল্গুধারায় নিজেকে হারিয়ে ফেলি।
– তুমি সত্যি দেখতে পাও, আমি হাসলে মুক্তো ঝরে ? প্রশ্ন করে বড় বড় চোখ করে তাঁকিয়ে আমার দিকে।
– আমি দেখি। সবাই দেখে না। সত্যিকারের ভালবাসা হলে দেখতে পাওয়া যায়।
শিউলি হঠাৎ থমকে যায়, আমার দিকে তাকিয়ে ওর দৃষ্টি স্থির হয়। দৃষ্টিতে অতল গভীরতা। ভালবাসার ভারে সে দৃষ্টি আমাকে ছুঁয়ে যায়। আমার কাছে বিশ্বাস গচ্ছিত রেখে অনেকটা আত্মসমর্পনের ভঙ্গিতে আমার অনেক কাছে ঝুঁকে আসে শিউলি, যেন হৃদয়ের আবেগ ধরে রাখার শেষ প্রয়াস। এই প্রথম আমি স্পর্শের পূর্ব মুহূর্তে গভীর পুলকিত শিহরণে ভেসে গেলাম। আমার জীবনে এমন জ্যোৎস্না স্নাত আনন্দ আর দ্বিতীয় বার আসেনি।
শিউলির চোখে জল। স্ফটিক অশ্রুজলে জ্যোৎস্না ঠিকরে পড়ে। অশ্রুর অদৃশ্য অক্ষরে লেখা হয় দুটি প্রাণের প্রেম, প্রণয়ের কথা। শান-বাঁধানো ঘাটে বসে দুজনেই আমরা লক্ষ কোটি যোজন দূরের দূরনক্ষত্রবাসীদের গান শুনতে পাই। সুরের মদিরা আকন্ঠ পান করে যৌবনের অসহায় সৌন্দর্যে আমরা বিহ্বল হই।
সত্যিকারের ভালবাসা কেমন হয়, আমি তা জানিনা। শিউলি আমার প্রথম ভালবাসা। ভালবাসা কখনও দ্বিতীয় হয়না। প্রেম হতে পারে ক্ষণকালের। ভালবাসা চিরদিনের। নির্ঝর ধারার মতো আবেগে উচ্ছল, তীব্র আর শীত সকালের শিশিরের মতো স্বচ্ছ, নক্ষত্রদ্যুতিতে উজ্জ্বল ভালবাসা।
সেই থেকে প্রতিটি পূর্ণিমার এমন রাতে চাঁদের রুপালি শরীর ছুঁয়ে নক্ষত্রদ্যুতি ভালোবাসা হয়ে আমাদের দুজনকে অলৌকিক আনন্দে, পুষ্পিত প্রেমের স্পন্দনে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
তারপরও জীবনের প্রয়োজনে জীবনকে ভুলে থাকা যায় না। ঢাকায় ফিরে আমার দুজনেই খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। শিউলি অনার্সের শেষ পরীক্ষাগুলো চলছিল বেশ অনেকদিন থেকে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ পরীক্ষাটি শেষ করে প্রায় প্রতিদিনই চাকুরীর জন্য পরীক্ষা দিয়ে চলছি। দিনগুলি কোনো মোতেই যেন সোনার খাঁচায় আটকানো যাচ্ছিলো না। মাঝখানে অনেকদিন আমাদের দেখা হয়নি।
সেদিন অনেকটা আকস্মিক শিউলি আমার খোঁজে এলো। কী যেন একটা জরুরি কথা আছে আমার সাথে। একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো। আকাশের কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সূর্য উঁকি দেয় আবার হারিয়ে যায়। গাছগুলির পাতায়, ফুলের পাপড়িতে মুক্তো বিন্দুর মতো লেগে আছে বৃষ্টির স্বচ্ছ স্ফটিক জলকণা। কাঠগোলাপের গাছটি ফুলে ফুলে উপচে পড়ছে। চারিদিকে একটা মন মাতানো ঘ্রাণ। আমি অবাক হয়নি। শিউলিরা যেখানে যায়, সেখানটাই এমন মায়াবী হয়, একটা অন্যরকম মন মাতানো সুন্দর ঘ্রাণে প্লাবিত হলো চারিদিক। আমি আমার অস্তিত্ব ভুলে যেতে থাকি। রূপকথার জগতেও এমন সুন্দর পৃথিবী নেই। আনন্দরা দলবেঁধে লম্বা গ্রীবার সাদা রাজঁহাস হয়ে আমার মনের আকাশে উড়ে উড়ে যায়। শিউলির মুখে-চোখেও বৃষ্টি ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে।
আমার ঘোর কাটতেই, ওকে হঠাৎ অনেকটা বেশি বিষণ্ণ মনে হলো। আমরা পাশাপাশি বসলাম। তারপরও মনে হলো আমরা একজন থেকে অন্যজন অনেক দূরে, ভিনগ্রহের আলাদা দুজন মানুষ।
– মেঝো মামা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। শিউলি একটু থেমে, অনেকটা আচ্ছন্ন, অনেকটা ঘোরের মধ্যে আবারো বললো,
– কী কিছু বলছোনা কেন? আসছে ছুটিতে বিয়ে। ছেলে ফ্রান্সে স্থায়ী, বিয়ের পর সেখানেই নিয়ে যাবে। খুব ভালো অবস্থা।
শিউলির চোখে জল। সে অশ্রুজলে জ্যোৎস্নার স্ফটিক স্নিগ্ধ কারুকাজ নেই। আছে অনাদরে ম্রিয়মান কালো গোলাপের একরাশ বিমর্ষতা। আমার ভেতর থেকে আচমকা একটা ধাক্কা এসে লাগে।
শিউলির বাবা বেঁচে নেই। এমন ভালো প্রস্তাব আরেকবার আসবে না। আমি চুপ করে আছি। যেন পালাবার পথ খুঁজছি। অপার্থিব আনন্দের নক্ষত্রদ্যুতি- জ্যোৎস্না রাতের কথা ভুলে গিয়ে আমি আত্মমগ্ন হয়ে পড়ি।
আমার এমন হয়, কাউকে সরু সিঁড়ি ধরে পার করতে পারি, অনেক নিচে উত্তাল স্রোত আমার বুকে কাঁপন ধরায় না। অথচ জীবনের জটিলতায় পালাবার পথ খুঁজি।
শিউলি চলে গেলে আকাশ কালো করে প্রচন্ড এক ঝাঁপটা বৃষ্টি হলো। এই প্রথম আমার বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ইচ্ছা হলো।
কদিন পরেই ছুটি হয়ে গেল। আগে থেকেই বলা ছিল একসাথে স্টিমারে করে বরিশাল ফিরবো।
স্টিমারের প্রসস্থ সিঁড়ি, তারপরও শিউলি আমার হাত ধরলো, যেন কোন এক অনিশ্চয়তায় পা বাড়াবার আগে একান্ত আস্থায় খানিকটা আশ্রয় খোঁজা। আমার খুব কষ্ট হয়।
প্যাডেলের বড় বড় স্লিপার পানির বুকে বিরামহীন আছড়ে পড়ে আর পানি কেটে তর তর করে এগিয়ে যায় বিশাল জলযান। পূর্ণিমার রাত ছিল সেদিনও।
তারপর কত রাত, কত দিন কেটে গেছে, ঘুরে ঘুরে আসে পূর্ণিমার চাঁদনী রাত, শিউলি ফিরে আসে না। বহুদিন আমার মুক্তো কুড়ানো হয় না।
শিউলি, তুমি দূরে চলে গিয়ে চিরদিন আমার অনেক কাছে রয়ে গেলে -আমাদের চিরদিনের নক্ষত্রদ্যুতি ভালোবাসা।
Leave a Reply