মো. সাইদুর রাহমান খান
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সচিবালয়। যেখান থেকে পরিচালনা করা হয় রাজ্যের সরকারি সকল কার্য। সেই মহাকরণ নিয়ে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। আজকে আমরা জানবো সেই মহাকরণের ইতিবৃত্ত।
ইংল্যান্ডে ছিলেন ছুতোর। উপনিবেশ কলকাতায় এসে টমাস লিয়ন হয়ে গেলেন স্থপতি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকেই দিল এক বিশাল বাড়ি তৈরির কাজ। সে বাড়িতে বসে কাজ করবেন করণিকরা। সাম্রাজ্য যত বাড়ছিল, ততই দরকার হয়ে পড়ছিল কাজ করার লোকের। প্রথমে ব্রিটিশ-সহ ইউরোপীয়রাই ছিলেন সেই শ্রেণিতে। পরে তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিল শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায়।
কালের স্রোতে গুরুত্বভার হারিয়ে ‘করণিক’ হয়ে গেল ‘কেরানি’। লিয়ন সাহেবের পরিকল্পনায় তৈরি সেই বাড়িতে বসে তাঁরা কাজ করতেন। তাই লাল ইটের সেই ভবনের নাম হল ‘মহাকরণ’।
কালের স্রোতে গুরুত্বভার হারিয়ে ‘করণিক’ হয়ে গেল ‘কেরানি’। লিয়ন সাহেবের পরিকল্পনায় তৈরি সেই বাড়িতে বসে তাঁরা কাজ করতেন। তাই লাল ইটের সেই ভবনের নাম হল ‘মহাকরণ’।
করণিকদের কাজ ছিল মূলত লেখালেখির। কলম পেষার কাজ থেকেই কোম্পানির নিচুতলার এই কর্মীদের পরিচয় ছিল ‘রাইটার’। তাঁরা যে বাড়িতে বসে কাজ করেন, সেটাই ‘রাইটার্স বিল্ডিং’। এই ভবন নির্মাণের জন্য যে জমি নির্ধারিত হয়েছিল, সেখানে আগে ছিল সেন্ট অ্যান চার্চ। ষোড়শ শতকের প্রথমে তৈরি এই গির্জা ছিল কলকাতায় ব্রিটিশদের তৈরি প্রথম উপাসনাস্থল। কিন্তু দু’দশকের বেশি স্থায়ী হয়নি তাঁর অস্তিত্ব।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে গির্জাটি। শেষে কার্যত পরিত্যক্ত গির্জা এবং তার চারপাশের জমিই নির্ধারিত হল রাইটার্স বিল্ডিং তৈরির জন্য। পুরনো ফোর্ট উইলিয়মের কাছে ১৭৭৭ থেকে ১৭৮০, এই ৩ বছর ধরে তৈরি হল করণিকদের ভবন। কাজের তত্ত্বাবধানে ছিলেন তৎকালীন গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম হেস্টিংস। নতুন ভবন এবং তার চারপাশের এলাকাকে সে সময় এর স্থপতির নামে বলা হত ‘লিয়ন্স রেঞ্জ’।
বরাদ্দ করা জমির ৩৭,৮৫০ বর্গফুট জুড়ে তৈরি হয়েছিল ভবনের মূল অংশ। কলকাতায় এটাই নাকি প্রথম তিন তলা বাড়ি। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রথমে ১৯টি থাকার ভবন ছিল। তবে এর চেহারা দেখে হতাশ হয়েছিল সেকালের ব্রিটিশ সমাজ। তাঁদের কাছে মনে হয়েছিল ভবনটিকে দেখতে কোনও মলিন হাসপাতালের মতো।
ভবনটির গঠনশৈলি মুগ্ধ করতে পারেনি কলকাতায় থাকা সেকালের ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় সমাজকে। তাঁদের মনে হয়েছিল, কাজের প্রয়োজনে তৈরি এই ভবন দাঁড়িয়ে আছে শিল্পসুষমা থেকে দূরে। তবে উপনিবেশ শাসনের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই এই ভবন ব্রিটিশদের কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন ভবনে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের জন্য সচেষ্ট ছিল ব্রিটিশরা। ইংল্যান্ড থেকে কাজ করতে আসা তরুণরা বাধা পাচ্ছিলেন ভাষা সমস্যার জন্য। সংস্কৃত, বাংলা, উর্দু, আরবি, ফার্সি-সহ একাধিক প্রাচ্য ভাষা শেখানোর প্রয়োজন হল তাঁদের। সেই প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি হল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। পরে কিছু জটিলতার জন্য সেই কলেজ উঠে আসে রাইটার্স ভবনে।
কলেজের প্রয়োজনে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হল। ৩২ জন পড়ুয়ার জন্য ছাত্রাবাস, পরীক্ষার হল, লেকচার হল, চারটি লাইব্রেরি-সহ বেশ কিছু নতুন সংযোজন হল দু’দশক ধরে। পরে অবশ্য কলেজটি এখান থেকে আবার স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল রাইটার্স বিল্ডিংয়ের জন্য দক্ষ কর্মী প্রস্তুত করা।
কলেজের প্রয়োজনে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হল। ৩২ জন পড়ুয়ার জন্য ছাত্রাবাস, পরীক্ষার হল, লেকচার হল, চারটি লাইব্রেরি-সহ বেশ কিছু নতুন সংযোজন হল দু’দশক ধরে। পরে অবশ্য কলেজটি এখান থেকে আবার স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল রাইটার্স বিল্ডিংয়ের জন্য দক্ষ কর্মী প্রস্তুত করা।
গ্রেকো রোমান স্থাপত্যের সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের নির্মাণশৈলিতে মিশে গিয়েছে ফরাসি নবজাগরণের প্রভাবও। ভবনের মাথায় রয়েছে প্রাচীন রোমান সভ্যতার জ্ঞান, যুদ্ধ ও ন্যায়ের দেবী মিনার্ভার মূর্তি। এ ছাড়াও এই ভবনে আছে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার দেবদেবী জিউস, হার্মিস, আছেনা এবং দিমিতার-এর মূর্তি। তাঁরা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যথাক্রমে বিচার, বাণিজ্য, বিজ্ঞান এবং কৃষির উন্মেষের প্রতীক হয়ে।
গ্রেকো রোমান স্থাপত্যের সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের নির্মাণশৈলিতে মিশে গিয়েছে ফরাসি নবজাগরণের প্রভাবও। ভবনের মাথায় রয়েছে প্রাচীন রোমান সভ্যতার জ্ঞান, যুদ্ধ ও ন্যায়ের দেবী মিনার্ভার মূর্তি। এ ছাড়াও এই ভবনে আছে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার দেবদেবী জিউস, হার্মিস, আছেনা এবং দিমিতার-এর মূর্তি। তাঁরা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যথাক্রমে বিচার, বাণিজ্য, বিজ্ঞান এবং কৃষির উন্মেষের প্রতীক হয়ে।
২৪০ বছরের প্রাচীন এই ভবনে যুগে যুগে বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রশাসনিক প্রয়োজনে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন ভবন। কিন্তু আড়ালে চলে গেলেও স্তিমিত হয়নি ব্রিটিশ-সহ অন্য ইউরোপীয় প্রভাব। কলেবরের সঙ্গে বদলেছে ভবনের নামও। টমাস লিয়ন্সের নামে একসময়ে রাইটার্স বিল্ডিং-সহ এই এলাকাকে লিয়ন্স রেঞ্জ বলা হত। কিন্তু সে নাম সূত্রপাতের পরে বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
বরং, লালদীঘিকে মনে রেখে ঔপনিবেশিকদের কাছে এই চত্বর হয়ে গিয়েছিল ‘ট্যাঙ্কস স্কোয়্যার’। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে গেল তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির নাম। ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৬, ৮ বছর তিনি ছিলেন ভারত শাসনের দায়িত্বে। দায়িত্বভার শেষ হওয়ার পরে ফিরে যান জন্মভূমিতে। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত হন স্কটল্যান্ডের মিডলোথিয়ানের ডালহৌসি প্রাসাদে। তাঁর মৃত্যুর ১৬১ বছর পরেও বাঙালি বাসে উঠে ‘একটা ডালহৌসি’-র টিকিট কাটতে অভ্যস্ত।এর রক্তক্ষয়ী পর্বের মধ্যে দিয়ে আমাদের অপিসপাড়া তাঁর নাম পরিচয় পাল্টে হয়ে গিয়েছে ‘বিবাদী বাগ’ হয়ে গিয়েছে, সে কথা আমাদের মনে থাকে না। বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া শহরবাসী বিস্মৃত হলেও রাইটার্স বিল্ডিংয়ের গথিক বারান্দা কিন্তু মনে রেখেছে ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বরের কথা।
এর রক্তক্ষয়ী পর্বের মধ্যে দিয়ে আমাদের অপিসপাড়া তাঁর নাম পরিচয় পাল্টে,,,,
Leave a Reply