সিয়াম মাহমুদ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
একজন খোরশেদ আলম -যিনি একাধারে ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক, প্রাদেশিক সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা, সংবিধান প্রণেতা, এমপি, গভর্ণর এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সহচর। আজ অগ্নিঝরা মার্চের ১৫ তারিখ, বৃহত্তর কুমিল্লার মহান নেতার ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী।
অধ্যাপক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, মহান মুক্তিযোদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ১৯৭২ এর সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, স্বাধীনোত্তর কুমিল্লা জেলা সদর আসনের প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য ও গভর্ণর এবং বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের প্রথম সভাপতি ছিলেন।
খ্যাতনামা এই শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ ১৯২৯ সালের ৪ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার খাড়েরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম হাজী মইনুদ্দীন ভূঁইয়া ও মাতা মরহুম ফাতেমা খান। তিনি ১৯৪৪ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল হতে মেট্রিকুলেশন, ১৯৪৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ হতে আইএসসি ও ১৯৪৮ সালে বিএসসি এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এসসি পাস করেন। এম.এসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পূর্বেই ১৯৫০ সালে মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে যোগদান করেন। তারপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রায় দু’দশক অধ্যাপনা করেন। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে বদলি হন এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অধ্যাপনার সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন ও ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর কুমিল্লা সদর আসনে আওয়ামী লীগ হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। অধ্যাপনার সময় ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের ২৩ তারিখ “পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে” কুমিল্লা টাউন হলে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে সারাদেশে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ দিলে বৃহত্তর কুমিল্লার সকল এমএনএ ও এমপিএ-দের সম্মতিক্রমে অধ্যাপক মোহাম্মদ খোরশেদ আলমকে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের ‘আহ্বায়ক’ করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের বহু ক্যাম্প স্থাপিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টরের ‘সিভিল লিয়াজোঁ অফিসার’ এর দায়িত্ব পালন করেন।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’র সদস্য হন। ১৯৭৩ সালে পুনরায় কুমিল্লা সদর আসন হতে আওয়ামী লীগের টিকেটে জাতীয় সংসদ সদস্য(MP-এমপি) নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক কুমিল্লা জেলার গভর্নর নিযুক্ত হন। দীর্ঘ ২২ বছর কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া এছাড়া কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ জাতীয়করণ বিরোধী আন্দোলন, কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড স্থাপনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রথিতযশা এই শিক্ষাবিদের ছাত্ররা বহু উচ্চতর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং এখনও আছেন। তিনি স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটির সদস্য, বার্ড(BARD) এর বোর্ড অব গভর্নরস, কুমিল্লা রেডক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান, কুমিল্লা জেলার রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান, কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের আহ্বায়ক সহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম ২০০৭ সালের ১৫ই মার্চ রাজধানী ঢাকার কমফোর্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
Leave a Reply