পুত্রশোক নিয়েই দেশমাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধা দম্পতি, অগ্নিকন্যাখ্যাত মিসেস দিলারা হারুন ও তার স্বামী একেএম হারুনুর রশীদ। এ দম্পতি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব থেকে দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব রণাঙ্গনের ২নং সেক্টরে বিভিন্ন পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিলেন। বর্তমানে তারা দুজনই প্রয়াত। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা বেগম দিলারা হারুন তার জীবদ্দশায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পুত্র হারানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগে আপস্নুত ও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তেন।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলতেন, ১৯৭১-এর মার্চ মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে পাক-হানাদারবাহিনী। পাকিস্তানি বিমান থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি বোমা হামলা চালানো হতো। এ অবস্থায় শহরে টিকতে না পেরে তিনি তার দেড় বছরের কন্যাসন্তান শিরীন সুলতানা কংকন, পাঁচ মাস বয়সি পুত্রসন্তান সঞ্চয় ও স্বামীকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌলভীপাড়ার বাসা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম রতনপুরে চলে যান।
সেখানে যাওয়ার কয়েক দিন পর তিনি, তার কন্যা শিরীন সুলতানা কংকন ও শিশুপুত্র সঞ্চয় কলেরায় আক্রান্ত হয়। গ্রামে চিকিৎসার তেমন সুযোগ না থাকায় এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় ‘সঞ্চয়’ মৃতু্যর কোলে ঢলে পড়ে।
মা হিসেবে সন্তান হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি, তার স্বামী ও দেড় বছর বয়সি কন্যা শিরীন সুলতানা কংকনকে নিয়ে কয়েকদিনের অমানবিক কষ্ট স্বীকার করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় পাড়ি দেন।
আগরতলায় গিয়ে বেগম দিলারা হারুন সেখানকার জিবি হাসপাতালে বাংলাদেশের আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। পরম মমতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ওই হাসপাতালে তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার মধ্যদিয়ে তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আদায় করে নেন। দেড় বছরের কন্যা শিরীন সুলতানা কংকনকে পাশের বাসার লোকজনের কাছে রেখে প্রতিদিন সকালে তিনি ও তার স্বামী দুজনই বেরিয়ে পড়তেন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য। সন্ধ্যার পর ফিরতেন সন্তানের কাছে।
বেগম দিলারা হারুন জিবি হাসপাতালেই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি ২নং সেক্টরে গঠিত ভ্রাম্যমাণ সাংস্কৃতিক সংস্থার সক্রিয় সদস্য হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে ক্যাম্পে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তার স্বামী অধ্যাপক একেএম হারুনুর রশীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পলিটিক্যাল মোটিভেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা ও আখাউড়া উপজেলার বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেন। বেগম দিলারা হারুন ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর কাছে অগ্নিকন্যার খ্যাতি লাভ করেন। বেগম দিলারা হারুন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হন। তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে দিলারা হারুন বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে শুভেচ্ছা সফরে পশ্চিম জার্মানি গমন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি মহকুমা আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকার পাশাপাশি দীর্ঘদিন কুমিলস্না জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকার দায়িত্বও পালন করেন। ২০১২ সালের ১৪ এপ্রিল দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
Leave a Reply