বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৯:৫৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
কসবায় অবৈধ ড্রেজিংবিরোধী অভিযান, ২টি ড্রেজার ধ্বংস ও ১ লাখ টাকা জরিমানা কসবায় তরুণ মানব সেবা সংগঠনের উদ্যোগে স্বর্ণপদক কুরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ আল্লামা গোলাম হাক্কানী পীর সাহেব (র) আমার শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ কসবায় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নবগঠিত কমিটি শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর,শিক্ষার উন্নয়নে কাজের প্রত্যাশা কসবা ব্যাংক সোসাইটির উদ্যোগে শিক্ষোপকরণ বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কসবায় ব্যাংকার্স ফোরামের ১ম বর্ষপূর্তি উদযাপন টিডিএসে দ্বিতীয়বারের মতো “জিয়া ক্রিকেট টুর্নামেন্ট” অনুষ্ঠিত কসবাসহ বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবির অভিযান প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকার ভারতীয় অবৈধ মালামাল জব্দ ট্রাফিক এন্ড ড্রাইভিং স্কুলে স্বাধীনতার ঘোষককে নিয়ে সেমিনার আয়োজন বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই
কারাগারে নয়, হৃদয়ের জায়গা ক্লাসঘরে

কারাগারে নয়, হৃদয়ের জায়গা ক্লাসঘরে

— দীপক সাহা

“পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে”-একথা বলার অপরাধে ১৬০০সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি সর্বজনসমক্ষে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল “জিওদ্রার্নো ব্রুনো”কে। ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের সংঘাতের নির্মম বলি জিওর্দানো ব্রুনো। বিজ্ঞানের প্রথম শহীদ ‘জিওর্দানো ব্রুনো’। যুগে যুগে জিওনার্দো ব্রুনোরা সত্যের সন্ধানে নিজের প্রাণ বলিদান করেছেন। আবহমানকাল থেকে ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সংঘাত চলে আসছে।ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে অনেক বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষকে হেনস্তা, এমনকি প্রাণে মেরা ফেলা হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতেও সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ইসলাম ধর্মকে অবমাননার অভিযোগে গত ২২ শে মার্চ বাদী হয়ে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ। ওই দিনই শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৩ শে মার্চ ও ৪ ঠা এপ্রিল আদালতে হৃদয় মণ্ডলের জামিন চাওয়া হয়েছে। প্রথমে জামিনের আবেদন নাকচ হলেও পরবর্তীতে আদালত জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। তাঁকে চাকরি থেকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

হৃদয় মণ্ডল ২২ বছর ধরে স্কুলে বিজ্ঞান ও গণিত পড়িয়ে আসছেন। গত ২০ শে মার্চ দশম শ্রেণির ছাত্রদের সাথে তাঁর ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্নোত্তরের একটি ভিডিও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। প্রায় ১৩ মিনিটের এই টেপটি ওই ক্লাসের ছাত্রদেরই রেকর্ড করা, যেটা পরে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। শিক্ষক ও ছাত্রের প্রশ্নোত্তরের পুরো ট্রান্সক্রিপটি পড়লাম। সম্পূর্ণ ব্যাপারটি উদ্যেশ্যপ্রণোদিত ও পূর্ব পরিকল্পিত। প্রশ্নোত্তরের কথোপকথনটি পড়লে জানবেন যে শিক্ষার্থীরা এক পর্যায়ে শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে “প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ” বই পড়তে উপদেশ দিচ্ছে। এই বইই আমাদের নতুন প্রজন্মকে শেষ করে দিচ্ছে। এই বই পড়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিজ্ঞান বিমুখ হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে স্পষ্ট, হৃদয় মণ্ডল কিন্তু বিষয়ের বাইরে কোনও কথা বলেননি। বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবেই উনি উত্তর দিয়েছেন। উনি বলেছেন, ধর্মটা বিশ্বাসের বিষয় আর বিজ্ঞানে প্রমাণ লাগে-যুক্তি লাগে। তাঁর বক্তব্য মোবাইলে রেকর্ড করা, তাঁর বিরুদ্ধে একদল শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ দেখানো এবং তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনাকে পূর্ব পরিকল্পিত মনে করছেন অনেকে। প্রথমে পুলিশের গ্রেপ্তার, তারপর মামলা এবং তারপর দুটি আদালতে অনেক টালবাহানার পর তাঁর জামিন ঘটনার পরম্পরায় অনেকের মত, হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে মামলা ‘একাডেমিক ফ্রিডম’র উপর আঘাত। পত্রপত্রিকা থেকে যতটুকু জেনেছি, স্থানীয়দের একটা চাপ ছিল, কিছু মানুষকে সন্তুষ্ট করতে এভাবে মামলাটা সাজানো হয়েছে। এই ঘটনা মৌলবাদী অসহিষ্ণুতার এক বড় উদাহরণ।

শিক্ষকের দিক থেকে ধর্মীয় অবমাননার কোনও প্রয়াস তো ছিলই না, বরং যুক্তি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর ও ব্যাখ্যা করার একটি মনোভঙ্গি এতে স্পষ্ট ছিল। তাঁর যুক্তি ও ব্যাখ্যার ধরন ও মান শিক্ষকসুলভ। এত ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কারা প্রভাবিত করেছে সেটা খতিয়ে দেখার বিষয়। উনি যে ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন, এটার সাথে ধর্মীয় কোনো বিদ্বেষ নেই। বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যেরকমটা ব্যাখ্যা দেওয়া উচিৎ, উনি তাই দিয়েছেন। এটা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হতেও পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু সেজন্য মামলা হবে ? তাহলে একজন শিক্ষকের স্বাধীনতা কোথায়?

ধর্মকর্মের প্রতি আমাদের একধরনের মূল্যবোধ কাজ করে, কিন্তু সেটার সঙ্গে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে সেখানে তাকে বিপদগ্রস্ত করা, এটা কোনও অবস্থাতেই কাম্য না। এখন উপমহাদেশে কোনও কিছু ঘটলে সেটিকে যেকোনো উপায়েই হোক ধর্মীয় দিক থেকে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ধর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সব মহলেই দেখা যায়। সকল স্তরেই ধর্মকে শিখণ্ডী খাড়া করে সমাজে সাম্প্রদায়িক দূষণ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হৃদয় মণ্ডলের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এর আগেও আমরা দেখেছি এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রও সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এমতাবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁদের দিকে প্রগতিশীলদের বৃহৎ অংশের কয়েকটি সহজ প্রশ্ন–স্বাধীনতার ৫১ বছর পেরিয়ে তাহলে কোন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হল যেখানে একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না? কেন রাষ্ট্র বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি? কেন সেখানে যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম চালু হল না? মৌলবাদী চিন্তাধারার ধারক ও বাহকদের বাড়বাড়ন্তে রাষ্ট্রের কি নীরব প্রশ্রয় আছে?

বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে যুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলার পর মামলার আসামি হয়ে মুন্সীগঞ্জের হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ চলছে বাংলাদেশের সর্বত্র। বাংলাদেশের শিক্ষকমহল উদ্বিগ্ন। শুধু জামিন নয়, হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হওয়ার পাশাপাশি রাজপথেও কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। বিশিষ্টজনরা দাবি তুলছেন, যে কিশোর ছাত্ররা মৌলবাদী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে অপমান করে পুলিশে নালিশ করেছে, তাদের মধ্যে মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক ভূমিকা পালন করুক। ওই ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের যারা সহযোগিতা ও ইন্ধন যোগাচ্ছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও করা হয়েছে।
শিক্ষাঙ্গনে মৌলবাদের অনুপ্রবেশের কারণে একজন বিজ্ঞান শিক্ষককে বিনা দোষে কারাগারে যেতে হয়েছে। খুবই দুর্ভাগ্যজনক, নিন্দনীয়। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। আশঙ্কা, এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। এই ঘটনা বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করবে। বিজ্ঞান চর্চাকেও ধর্মের নাগপাশ থেকে মুক্ত না করতে পারলে হৃদয় মণ্ডলের মতো ঘটনা বারে বারে ঘটবে। ধর্মের গোঁড়ামির বদ্ধজলায় নিমজ্জিত এক বৃহত্তর শ্রেণির মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে পারল না। এই শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ঘটনা তার প্রমাণ।

বিজ্ঞান চর্চাকে আমরা তৃণমূলস্তরে বিস্তার করতে পারিনি। ধর্ম এবং বিজ্ঞানের কোনও বিরোধ ছাড়াই লেখাপড়ার পরিবেশ কাম্য। বিজ্ঞান শিক্ষাকে সমাজের সর্বস্তরে এখনও সঠিকভাবে চর্চা করা হচ্ছে না। সমাজকে ইতিহাস চর্চার ব্যাপারে, ধর্ম চর্চার ব্যাপারে, রাজনৈতিক চর্চার ব্যাপারে আরও সহনশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে সর্বাগ্রে বিবেচ্য। সাধারণ মানুষকেও কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিবোধহীন মুখোশকে ছিঁড়ে ফেলে সত্যকে স্বীকার করতে হবে। ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে আপাত কোন বিরোধ নেই। ধর্ম মানুষকে আত্মিক পরিশুদ্ধি দেয় আবার বিজ্ঞান ছাড়া জীবন অপরিহার্য এটুকু মনে রাখলে আমাদের এমন পরিস্থিতি দেখতে হবে না।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD